নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০২৫, শনিবার।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ৫০৫টি আসন শূন্য রেখেই ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে, লক্ষাধিক শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করেনি, এবং দেশের ৩৭৮টি কলেজ একাদশ শ্রেণিতে কোনো আবেদন পায়নি। এই অভূতপূর্ব সংকটের পেছনে জুলাই ছাত্র আন্দোলন, অটোপাস নীতি, অযাচিত বিষয়ে আন্দোলন, মারামারি এবং ক্লাস বর্জনের প্রভাবকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকরা।
ঢাবিতে শূন্য আসনের সংকট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইউনিটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) এবং ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি (এসিটি) বিভাগে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ৫০৫টি আসন শূন্য থেকে গেছে। শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মেধার মান এবং ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির ঘাটতি এর প্রধান কারণ।
কলেজে ভর্তির আবেদনহীনতা
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির ভর্তির জন্য ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ জন শিক্ষার্থী আবেদন করলেও, ২৫ হাজার ৩৩ জন কোনো কলেজে মনোনয়ন পাননি, যার মধ্যে ৫ হাজার ৭৬৫ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত। এছাড়া, ৩৭৮টি কলেজে কোনো আবেদন জমা পড়েনি, যা শিক্ষার্থীদের জনপ্রিয় কলেজের প্রতি একপেশে ঝোঁক এবং কম পরিচিত প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনীহার ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার ও রাজনৈতিক দাবি নিয়ে ছাত্র আন্দোলন শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এই সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ শিক্ষা থেকে আন্দোলনের দিকে সরে যাওয়ায় মেধার মান এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি কমে যায়।
আন্দোলন পরবর্তি সময় গৃহীত অটোপাস ও সাবজেক্ট ম্যাপিং ফলাফল প্রদান নীতি শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ার একটি বড় কারণ। এই নীতির ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রকৃত যোগ্যতা ছাড়াই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, যা তাদের ঢাবির মতো কঠিন ভর্তি পরীক্ষার জন্য অপ্রস্তুত করে তুলেছে। শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, “অটোপাস শিক্ষার্থীদের মেধার মানকে দুর্বল করেছে, যা উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে প্রভাব ফেলছে।”
বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক এবং অযাচিত বিষয়ে আন্দোলন, মারামারি এবং ক্লাস বর্জন শিক্ষার পরিবেশকে বিঘ্নিত করেছে। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহানির কারণ হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, জুলাই আন্দোলন এবং অটোপাস নীতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত প্রস্তুতি ও মনোযোগে ঘাটতি সৃষ্টি করেছে। এছাড়া, ক্লাস বর্জন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। ফলে, ঢাবিতে শূন্য আসন এবং কলেজে ভর্তি সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন পুনর্বহাল করা এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং শিক্ষার মান উন্নত করতে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।” এই সংকট বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনে সরকার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
