নিজস্ব প্রতিবেদক। কক্সবাজার, ২৩ আগস্ট ২০২৫, শনিবার।
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত অভিনব কৌশলে ইয়াবা ও আইসের মতো মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে পাচার হচ্ছে, যার বিনিময়ে দেশ থেকে পাচার হচ্ছে খাদ্য, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এই মাদক পাচারের পেছনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং ট্রান্স ন্যাশনাল সিন্ডিকেটের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। এই মাদকের বিস্তার যুবসমাজে বিকৃত মানসিকতা, উগ্রতা ও উন্মাদনার মতো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পণ্যের বিনিময়ে মাদক পাচার
গত নয় মাস ধরে বাংলাদেশ থেকে চিনি, সার, পেঁয়াজ, সিমেন্ট, জ্বালানি তেল, শুঁটকি, চিংড়ি পোনা, শাড়ি, কসমেটিকস, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমারের আরাকান আর্মির কাছে পাচার হচ্ছে। এর বিনিময়ে ইয়াবা, আইস এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই পাচারকাজে মাছ ধরার নৌযান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সাগরপথে ও নাফ নদ হয়ে টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং থানচির দুর্গম এলাকা দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। এই মাদক তারপর ১৭টি পথে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে শত শত বাহক জড়িত।
আরাকান আর্মি ও ট্রান্স ন্যাশনাল সিন্ডিকেটের ভূমিকা
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই অঞ্চল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম দপ্তরের উপপরিচালক হুমায়ুন কবির খন্দকার জানান, ট্রান্স ন্যাশনাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই পাচারকাজ পরিচালিত হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা মিয়ানমার ও টেকনাফ সীমান্তে সক্রিয়। আগে ইয়াবার বিনিময়ে ডলার, টাকা বা স্বর্ণ ব্যবহৃত হলেও, বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আরাকান আর্মি পণ্যের বিনিময়ে ইয়াবা ও আইস সরবরাহ করছে।
কোস্ট গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান
কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এই পাচার রোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। গত ১১ আগস্ট চট্টগ্রামের হালিশহরের কাট্টলী ঘাটে ৭৫০ বস্তা সিমেন্ট ও দুটি বোটসহ ২০ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়। ৮ আগস্ট বাঁশখালীতে ১০০ বস্তা সিমেন্টসহ একটি বোট জব্দ করা হয়। এছাড়া, ৩ জুলাই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ জয়নাল আবেদীন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি কাপড়ের বিনিময়ে ইয়াবা সংগ্রহ করেছিলেন। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মো. সিয়াম-উল-হক জানান, পাচারকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিনিময়ে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক আনা হচ্ছে। তবে মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
যুবসমাজে ইয়াবার ক্ষতিকর প্রভাব
ইয়াবার বিস্তার যুবসমাজে গভীর সংকট সৃষ্টি করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবার নেশা যুবকদের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা, উগ্র আচরণ এবং উন্মাদনা তৈরি করছে। এটি সামাজিক অস্থিরতা, পরিবারে বিচ্ছেদ এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। শিক্ষাবিদ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “ইয়াবার সহজলভ্যতা যুবকদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি তাদের শিক্ষা, ক্যারিয়ার এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।”
ইয়াবা, একটি কৃত্রিম মাদকদ্রব্য, বাংলাদেশের যুবসমাজের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা, উগ্রতা এবং উন্মাদনা সৃষ্টি করে সামাজিক ও পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই মাদক সেবনের ফলে যুবকদের মধ্যে আগ্রাসী আচরণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা তাদের শিক্ষা, ক্যারিয়ার এবং পারিবারিক সম্পর্কের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শারীরিকভাবে, ইয়াবা মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, অনিদ্রা এবং ক্ষুধামান্দ্যের কারণ হয়। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, দাঁতের ক্ষয় (মেথ মাউথ), লিভার ও কিডনির ক্ষতি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া, ইয়াবা সেবন মানসিক রোগ যেমন উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং সিজোফ্রেনিয়ার মতো সমস্যা সৃষ্টি করে, যা যুবকদের জীবনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।
মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের কারণে মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিজিবি ও কোস্ট গার্ড সীমান্তে টহল জোরদার করলেও, ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের ১৭২ কিলোমিটারই অরক্ষিত থাকায় পাচারকারীরা সুযোগ নিচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর অব. এমদাদুল ইসলাম বলেন, “সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের মাধ্যমে এই পাচার বন্ধ করা জরুরি। অন্যথায়, এটি জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।”
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. সাইফউদ্দিন শাহীন জানান, ২২-২৩টি সীমান্ত পয়েন্টে সিসিটিভি বসানো এবং মাদক কারবারিদের ডেটাবেস তৈরির কাজ চলছে। তিনি বলেন, “মাদক পাচার রোধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় সচেতনতা এই সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।”
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও আইসের পাচার বাংলাদেশের যুবসমাজ ও সমাজ ব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি। আরাকান আর্মি এবং ট্রান্স ন্যাশনাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই মাদক বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং যুবকদের মধ্যে মানসিক ও সামাজিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় সীমান্তে কঠোর নজরদারি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
