চাকরির বাজারে ধস: এক বছরে শিক্ষিত বেকার বেড়েছে দেড় লাখ

চাকরির বাজারে ধস: এক বছরে শিক্ষিত বেকার বেড়েছে দেড় লাখ
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক

গত জুলাই-আগস্টে কোটা এবং চাকরির বিভিন্ন দাবির নাম দিয়ে জঙ্গি হামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবর্তন ঘটিয়ে ইউনূস সরকারকে বসানো হলেও চাকরির বাজারে কোনো পরিবর্তনই আসেনি। বরং এক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়, ২০২৪ সালের শেষে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখে, যা ২০২৩ সালের সাড়ে ২৫ লাখ থেকে দেড় লাখ বেশি।

এই সংখ্যা একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার কর্মহীন শ্রমিকের সংখ্যার বাইরে। শিল্পখাতে লক্ষাধিক শ্রমিক বর্তমানে কর্মহীন।

২০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরি জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শেষ করা তরুণদের। শ্রমশক্তি জরিপের (অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০২৪) তথ্যমতে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে দেশের শ্রমশক্তি ছিল ৫ কোটি ৮৯ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৭৪ লাখ ৯০ হাজার এবং নারী ১ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার।

শিল্প খাতে কর্মসংস্থান হ্রাস

গত এক দশকে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের সংখ্যা কমেছে। ২০১৩ সালে এ খাতে শ্রমিক ছিল ১ কোটি ২১ লাখ, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ১ কোটি ২০ লাখে। শিল্প খাতে সংকোচনের ফলে সামগ্রিক কর্মসংস্থানও প্রভাবিত হয়েছে।

গত এক বছরে সারাদেশে কয়েকশ কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে কর্মহীন শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক থেকে দেড় লাখের মত।

অন্যদিকে, প্রবাসে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ভাটা পড়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান ২২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ লাখে।

তরুণদের উদ্বেগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থী আহমদ জোবায়ের বলেন, “আমরা দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডায় শিক্ষার্থীরা প্রায় সবাই একটি প্রশ্নে আটকে যায়—পড়াশোনা শেষে ক্যারিয়ার কোন দিকে? কেউ বিদেশ যেতে চায়, কেউ সরকারি চাকরির আশায় থাকে, আবার অনেকে বলে যেকোনো চাকরি পেলেই করবে। এর মূল কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যারিয়ার গাইডলাইনের অভাব এবং রাষ্ট্রের অপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা।”

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান খান মনে করেন, সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার কারণে চাকরিজীবীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, “১১-২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে এখন বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এ কারণে দেশের মেধাবীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাদাত হোসেন বলেন, “নীতিগত অব্যবস্থাপনার কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষা অবকাঠামো দুর্বল। প্রতিবছর প্রায় ২৫ লাখ তরুণ স্নাতক সম্পন্ন করে, এর মধ্যে ১০ লাখ বিদেশে যায়। বাকিদের জন্য দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই।”

তিনি আরও যোগ করেন, টাকা পাচার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এতে হতাশ হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক নুরুল মোমেন বলেন, “প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও কর্মসংস্থান সীমিত। অনেকে সামান্য বেতনে চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছে, যা দিয়ে সচ্ছল জীবনযাপন কঠিন। প্রায় ১০ বছর আগের পে-স্কেল কাঠামোতে চাকরিজীবীরা বেতন পাচ্ছে, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।”

সামগ্রিক চিত্র

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে চাকরির বাজারে বড়সড় সংকট তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও চাকরির বাজারে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। তরুণদের ক্রমবর্ধমান হতাশা ও দক্ষতা ব্যবস্থাপনার অভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

Visited 17 times, 1 visit(s) today