গোলাম হোসেন,
আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী।
‘অমুক অপরাধ করেছিলো, তাই আমি অপরাধ করবো’, এটি আইন-আদালতে ক্রিয়াশীল কোন ব্যক্তির মনোভাব হতে পারেনা।অথচ বাংলাদেশের আইন আদালতে ইনিয়ে বিনিয়ে এমনই মনোভাব প্রকাশ করছে কিছু লোক।১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ইনডেমনিটি দিয়ে বিচারের পথ রোধ করার মাধ্যমে আইন আদালতের ওপর আঘাত আসে, তারপর বিভিন্ন সরকারের সময়ে সরকারের মনোভাবের ওপর নির্ভর করে বিচারকদের কে বিচারকার্য পরিচালনার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। অসাংবিধানিক সরকারকে বৈধতা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।কিন্তু বর্তমান অসাংবিধানিক সরকারকে বিচার বিভাগ বৈধতা না দিয়েই তাদেরকে মেনে নিয়েছে এবং তাদের মনোভাবের উপর নির্ভর করে বিচারকার্য পরিচালনা করছে।তর্কের খাতিরে বলা যেতে পারে, সংবিধানের আলোকে বিচার বিভাগে রেফারেন্স পাঠিয়ে বিচার বিভাগের মতামত নিয়েই বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে, যদিও আলোচ্য বিষয়ের স্বচ্ছতা ও সত্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে, তবুও তর্কের খাতিরে যদি বিষয়টি মেনে নেয়া হয়, তাহলেও কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন বড় আকারেই থেকে যায়, তাহলো, শপথ গ্রহণের দিন ও সময়ে সরকার প্রধান মিঃ ইউনুস দন্ডিত আসামী ছিলেন। কোন দন্ডিত (সাজাপ্রাপ্ত) ব্যক্তি রাষ্ট্রের কোন সাংবিধানিক পদে বহাল হতে পারেন না, বা থাকতে পারেন না। তাঁর দন্ড মওকুফ হয়েছে কিন্তু শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পরে, শপথ গ্রহণের দিন সে আদালতের রায়ে দন্ডিত আসামী ছিলেন, অতএব তাঁর শপথ গ্রহণটি সম্পূর্ণ রূপে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, অনৈতিক হয়েছে।
লেখার শিরোনামে কেনো বলেছি ‘খলনায়কেরকাছেপরাস্তবাংলাদেশেরআইন-আদালত, কফিনেশেষপেরেকঠুকলো!’
মিঃ ইউনুস বিশ্ববাসীর কাছে স্বীকার করেছেন, মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে এবং তিনি বাংলাদেশের আদালতের রায়ে দন্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি হয়েও সরকার প্রধানের মতো সাংবিধানিক পদে শপথ গ্রহণ করেছেন, অতএব তিনি খলনায়ক।তাঁর ডিজাইন এবং মনোভাবের কাছে বাংলাদেশের আইন আদালত পরাস্ত হয়েছে। দেশে কোনো আইনের শাসন নাই।আইন বলছে, কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন হলেই তিনি অপরাধী বিবেচিত হবেন না। যে পর্যন্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধ প্রমাণিত না হবে, সে পর্যন্ত বিচারকের কাছে আসামী নির্দোষ বলে প্রতীয়মান থাকবে এবং বিচারক আসামীর প্রতি নির্দোষ আছেন মর্মে মনোভাব দেখাবেন। আইন বলছে, বিচারক যদি মনে করেন, প্রাথমিকভাবে যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সে ব্যক্তি বিচারের সম্মুখীন থাকবেন এবং পলাতক হবেন না, তাহলে যত বড় অভিযোগই আনা হোক, আদালত তাঁকে জামিন মুক্তি দিতে পারবেন। এসবের কোন কিছুই বিচারকগণ বিবেচনায় নিতে পারছেন না।প্রফেসর কলিমউল্লাহ সাহেব কে জেলে পাঠানোর সময় আদালত মন্তব্য করেন, ‘জেলে এবং কবরে একাই যেতে হয়, জেলে ও কবরে যাওয়ার সময় কেউ সঙ্গী হয় না’, মন্তব্যটি আইন ও ধর্মীয় বিধি বিধানের কোনো মতেই সঠিক নয়। এটি আইনের ভাষা হতে পারেনা। ধর্মীয় বিধান বলছেন, কবরে যাওয়ার সময় আপনার কর্ম আপনার সঙ্গী হবে, কবরে কেউ একা যাবেন না, কর্মকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। জেলেও একা যাবেন না, কর্মকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। তবে যে কর্মে জেলে যাবেন, সে কর্ম আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ মর্মে সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। অপরাধ কর্ম প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কেউ জেলে যাবেন না।অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কাউকে জেলে আটক রাখার অর্থ বিনা বিচারে আটক রাখা, যা অমানবিক, শুধুমাত্র পালিয়ে যেতে পারে এমন সন্দেহ হলেই সাময়িক ভাবে আটক রাখা যায়।তবে প্রফেসর কলিমউল্লাহ, প্রফেসর আবুল বারাকাত, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুলহক, তারা যে পলাতক হবেন না, তার প্রমাণ আদালতের সামনে ছিলো, তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হওয়ার পর গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত তারা নিজ নিজ কর্মস্থল এবং আবাসস্থলে অবস্থান করছিলেন, তাদেরকে বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। এছাড়াও যাদের পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা নাই এমন অনেককেই গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হচ্ছে, বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণে বিচারকদের বিবেক পরাস্ত হয়েছে।আদালতের ভিতরে বিচারকের ওপর ডিম ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটেছে, আদালত চত্বরে আসামীকে মারধর করা হয়েছে, সারা দেশে মব সন্ত্রাস করে শতশত মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, হত্যা মামলার ভিকটিম অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি জীবিত আছেন, এমন ঘটনার বিষয়ও আমরা দেখছি, অথচ আইন আদালত নিরব।এককথায়, একজন খলনায়কের কাছে আইন আদালত পরাস্ত। এখন আসুন,
কেনো বলছি কফিনে শেষ পেরেক ঠুকলো!
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রেফতার করে পিছনে হাত বেঁধে আদালতে নেয়ার পর আদালত তাকে জামিনে মুক্তি না দিয়ে রিমান্ডের আদেশ এবং জামিন বাতিলের আদেশের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রমে তথা আইন-আদালতে সর্বশেষ পেরেক ঠুকেছে বলে আমি মনে করছি।কারণ বিচারক গ্রেফতারের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো, তা অদূর ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে, কমবেনা। তাই এখনই এর গতিরোধ করার প্রয়োজন ছিল।ভবিষ্যতে যখন বিচারক গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়বে, তখন কি হবে এদেশে ভাবুন! পরবর্তী সরকার এসেই তো বিচারক গ্রেফতারের মাধ্যমে আদালতের প্রতি তাদের অবস্থান জানান দেবেন। আর, এমন তর ঘটনা বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত। দেখুন, বিচারপতি খায়রুল হককে আদালতে নেয়ার পরই বিজ্ঞ বিচারক যদি আইনের মধ্যে থেকে বিবেকবান কোন আদেশ দিতে পারতেন, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা থাকতো না। কিন্তু, নিম্ন আদালতের বিচারক যা পারেননি, উচ্চ আদালতের বিচারক কি তা পারছেন?
আগস্ট ১১, ২০২৫ সোমবার বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মাননীয় বিচারপতি মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের জামিন আবেদনের শুনানির জন্য আবেদনটি কার্য তালিকায় ১৮ নম্বর ক্রমিকে ওঠে।আবেদনের শুনানির প্রশ্নে আদালতকক্ষে আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও ধাক্কা ধাক্কি হয়।২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীতে আবদুল কাইয়ুম হত্যা হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে ঘটনার একবছর পর ২০২৫ সালের ০৬ জুলাই সাবেক প্রধান বিচার পতি খায়রুল হক সহ অনেক জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা যাত্রাবাড়ী থানায় রুজু করা হয় এবং কথিত মামলায় গত ২৪ জুলাই বিচারপতি খায়রুল হক কে গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁকে পেছনে হাতবাঁধা অবস্থায় নিম্ন আদালতে হাজির করা হয়, অথচ বিচার বিভাগ এ বিষয়ে নীরব।শুনানির সময় আগত হলে বিচারপতি খায়রুলহকের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী একথা বলতেই আদালত কক্ষে হট্টগোল ও ধাক্কা ধাক্কির ঘটনা ঘটে। আদালতে খায়রুল হকের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কে রহমান, মনসুরুল হক চৌধুরী, মহসিন রশীদ, জেড আই খান পান্না, কামরুল হক সিদ্দিকী সহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।রাষ্ট্র পক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাসেল আহম্মেদ ও মো. এমরান খান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. উজ্জ্বল হোসেন ও জসিম উদ্দিন।বেলা তিনটার পর বিচারপতি খায়রুল হকের আবেদনটি শুনানির জন্য আদালতে উপস্থাপন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কে রহমান।এসময় এক সপ্তাহ সময়ের আরজি জানিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাসেল আহম্মেদ বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলায় শুনানিতে অংশ নেবেন।তখন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতির দুই হাত পিছনে নিয়ে বেঁধে হাতকড়া পরিয়ে নিম্ন আদালতে হাজির করা হয়েছে, তাঁকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে, এমতাবস্থায় আমরা শুনানি শুরু করি, তারপর অ্যাটর্নী জেনারেল এসে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবেন, একথা বলতেই রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীরা চিৎকার শুরু করে, উচ্চকন্ঠে বলতে শোনা যায়, বিচারপতি সিনহাকে যখন সরানো হয়, তখন কোথায় ছিলেন আপনারা! রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, হট্টগোল, গালিগালাজ ও বিচারপতি খায়রুল হকের আইনজীবীদের ধাক্কা মারতে দেখা যায়, আদালতের বিজ্ঞ বিচারপতিদ্বয় তখন নিরব! বলুন, বিচারপতি সিনহার ওপর অনিয়ম হয়েছে বিধায় এখন তারা বিচারপতি খায়রুল হকের ওপর অনিয়ম করবেন, এটি কি আইনের ভাষা? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এটি কখনোই আইনের ভাষা হতে পারেনা। এরই ধারাবাহিকতা যদি বাংলাদেশে অনাদিকাল চলতে থাকে, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ ভাবুন। প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব এবং আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা এ জাতিকে কোথায় নিয়ে যাবে ভেবে দেশের বিবেকবান মানুষ শংকিত, ব্যথিত ।
গোলামহোসেন,
আইনজীবীওরাজনৈতিককর্মী।
