❐ গাজীপুর প্রতিনিধি
গত জুলাইয়ে সরকারবিরোধী দাঙ্গার পর চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এখনো কমেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা, দায়িত্বশীলদের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাসহ নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষের ওপর মব সন্ত্রাস, মামলা, গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দেশের পুরো পোশাক খাতের ওপর নেমে এসেছে গাঢ় অন্ধকার। সারাদেশে হাজার হাজার কারখানা এখন বন্ধ। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধের উপক্রম। রাজনৈতিক হয়রানির কারণে মালিকপক্ষও ব্যবসা করে দিয়েছেন। অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ায় আটকে গেছে অর্থ। ফলে শ্রমিকদেরও মজুরি আটকে গেছে।
এমন অবস্থায় দেশের শিল্পাঞ্চল এবং তার আশপাশের এলাকাগুলোতে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসাতেও নেমে এসেছে মন্দা। গাজীপুরেরও এর প্রভাবে তৈরি পোশাক শিল্পে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ছে। গত এক বছরে জেলায় বন্ধ হয়ে গেছে ১০৬টি কারখানা। এতে বেকার হয়েছেন প্রায় ১ লাখ শ্রমিক। শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে কেউ গ্রামে ফিরে গেছেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা বা অটোরিকশা চালনার মতো কাজে যুক্ত হয়েছেন। আবার অনেকেই বেকার থেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
পুলিশের ভাষ্যমতে, বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে কেউ কেউ চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েছেন।

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ও সংকটের কারণ
কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, বর্তমানে জেলায় নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৬টি, এর মধ্যে পোশাক কারখানা ১ হাজার ১৫৪টি। শিল্প পুলিশ ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ই আগস্ট থেকে এ বছরের ৩রা আগস্ট পর্যন্ত শুধু গাজীপুরেই ১০৬টি পোশাক ও অন্যান্য শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে- বেক্সিমকোর ১৩টিসহ মাহমুদ জিন্স, ডার্ড কম্পোজিট, পলিকন লিমিটেড, টেক্সটিল ফ্যাশন, ক্ল্যাসিক ফ্যাশন, লা-মুনি অ্যাপারেলস, টি আর জেড গার্মেন্টস, রোয়া ফ্যাশনসসহ অনেক বিজিএমইএভুক্ত প্রতিষ্ঠান।
কারখানা বন্ধের পেছনে নানা কারণ রয়েছে— জ্বালানি সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক অর্ডার কমে যাওয়া, কার্যাদেশ বাতিল এবং এ কারণে বেতন বন্ধ হওয়া ও শ্রমিক অসন্তোষ-ভাঙচুর, সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের অসহযোগিতা। এর পাশাপাশি মার্কিন শুল্কনীতির চাপসহ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাক খাতে অর্ডার কমে যাওয়া—কারখানাগুলোকে সংকটে ফেলেছে।
কেয়া গ্রুপের উদাহরণ
গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ি জরুন এলাকার বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেয়া গ্রুপে একসময় ১৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু ধাপে ধাপে কারখানার ইউনিটগুলো বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের মজুরি ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি গত বছর অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে।
কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠান অভিযোগ করেন, কয়েকটি ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা ডিপোজিট না করায় প্রতিষ্ঠানকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করা হয়।
তার দাবি, “সাউথ ইস্ট ব্যাংক আমার এক হাজার মিলিয়ন রিয়েলাইজ পেয়েছে কিন্তু ৬০০ মিলিয়ন ডিপোজিট করেছে, বাকি ৪০০ মিলিয়ন করেনি। পূবালী ব্যাংক ২০০ মিলিয়ন রিয়েলাইজ পেয়েছে, কিন্তু ফরেন কারেন্সি জমা করেনি। ন্যাশনাল ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের কাছেও একই ধরনের সমস্যা হয়েছে।”
তার ভাষ্যমতে, ব্যাংকের সহায়তা পেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
বেকার শ্রমিকদের জীবনযাত্রা
শুধু শ্রমিক নয়, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শ্রমিক-নির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো। স্থানীয় মুদি দোকান, বাসা ভাড়া, খাবারের হোটেল, সেলুনসহ নানা ক্ষুদ্র ব্যবসায় ধস নেমেছে। মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি, কাশিমপুর, শ্রীপুর ও টঙ্গী এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার আশপাশের আবাসন ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোতে জনশূন্যতা তৈরি হয়েছে।
কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক পল্লিতে এখন হাহাকার। বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকে টেইলারিং, ছোট দোকান বা অটোরিকশা চালনার কাজে যুক্ত হয়েছেন। নারী শ্রমিকদের কেউ কেউ অন্যত্র কাজ পেলেও বেতনের শর্ত আগের মতো না থাকায় সংকটে পড়েছেন।
কাশিমপুরের বেক্সিমকো কারখানার সাবেক কর্মী সুফিয়া খাতুন জানান, “আমি প্রায় ১২ বছর বেক্সিমকোতে কাজ করেছি। ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ কারখানা বন্ধ করে দিলে ৫০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারান। আমি পাশের একটি ছোট কারখানায় কাজ পেয়েছি, বেতন কম হলেও টিকে আছি। তবে অধিকাংশ শ্রমিকই কাজ পাচ্ছেন না।”

টি আর জেড গার্মেন্টসের সাবেক শ্রমিক মারুফা আক্তার বলেন, “দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কাজ করেছি। এখন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছেলেমেয়ে নিয়ে ভীষণ কষ্টে আছি। নতুন কারখানায় আগের মতো সুবিধা পাচ্ছি না।”
কারখানা এলাকার দোকানপাটেও প্রভাব পড়েছে। জরুন এলাকার দোকানি আবু বক্কর জানান, আগে দিনে ১০-১৫ হাজার টাকার বেচাকেনা হতো, এখন তা নেমে এসেছে ১-২ হাজার টাকায়।
অনেক বাড়িওয়ালাও ভাড়াটিয়া হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন। গাছা এলাকার বাড়িওয়ালা সোহরাব হোসেন বলেন, “আগে ভাড়ার জন্য প্রতিদিন ভাড়াটিয়া আসত, এখন অনেক ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে।”
শ্রমিক আন্দোলন ও আইনশৃঙ্খলা
স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে –
- কাশিমপুরের বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি ইউনিট,
- টঙ্গির টিএমএস অ্যাপারেলস,
- কোনাবাড়ির পলিকন লিমিটেড, কেয়া গ্রুপ, অ্যাপারেল প্লাস, টিআরজেড, ডেল্টা নিট,
- কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকার নায়াগ্রা টেক্সটাইল, মাহমুদ জিন্স প্রভৃতি।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের বকেয়া বেতন এবং পাওনাদি এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর সভাপতি শফিউল আলম বলেন, “এক বছর আগে ডার্ড কম্পোজিট বন্ধ হলেও শ্রমিকদের পাওনা এখনো মেটানো হয়নি। মালিকরা দায়িত্ব নিচ্ছেন না, শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।”
কারখানা খোলার দাবি ও বকেয়া বেতনের দাবিতে প্রায়ই আন্দোলনে নামছেন বেকার শ্রমিকরা। মহাসড়ক অবরোধের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
বেকার শ্রমিকরা বকেয়া মজুরি ও কারখানা পুনরায় চালুর দাবিতে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছেন। এতে সড়কে যানজট ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ড. নাজমুল করিম খান বলেন, “কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য হুমকি। বেকার শ্রমিকদের কেউ কেউ ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।”
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আল মামুন শিকদার জানান, “মালিকানা পরিবর্তন, ব্যাংক ঋণ রিশিডিউল না করা, অর্ডার না পাওয়া—এসব কারণেই মূলত কারখানা বন্ধ হচ্ছে। তবে আর্থিক সংকটই সবচেয়ে বড় কারণ।”
মালিকদের দাবি ও করণীয়
বিজিএমইএ ও মালিকরা বলছেন, জ্বালানি সংকট নিরসন, ব্যাংক খাতে নীতিগত সহায়তা এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি উন্নত হবে না।
এসি শিল্প এস্টেট ও স্টাইলিশ গার্মেন্টস চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, “রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে মালিকরা কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য খারাপ খবর।”
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের গাজীপুরের সহকারী মহাপরিদর্শক (সাধারণ) মো. রবিউল ইসলাম বলেন, “পোশাক খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। আমরা কারণ অনুসন্ধান ও সমাধানের জন্য কাজ করছি।”
সকরুণ পরিস্থিতি
গাজীপুরে বর্তমানে নিবন্ধিত পোশাক কারখানা রয়েছে ১ হাজার ১৫৪টি। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু শ্রমিক নয়, ব্যবসায়ী, বাড়িওয়ালা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নীতি সহায়তা ও ব্যাংক খাতের সহযোগিতা না পেলে গাজীপুরসহ দেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

