সাদাপাথরে মহালুট: ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট পাথর খাওয়ার পর উদ্ধার মাত্র ১২ হাজার ঘনফুট!

সাদাপাথরে মহালুট: ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট পাথর খাওয়ার পর উদ্ধার মাত্র ১২ হাজার ঘনফুট!
শেয়ার করুন

❐ সিলেট প্রতিনিধি

সিলেটের ভোলাগঞ্জের ঐতিহাসিক সাদাপাথর এখন মহালুটের প্রতীক। গত বছরের ৫ই আগস্ট রাষ্ট্র ক্ষমতার পট-পরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের কিংস পার্টিখ্যাত এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংগঠন এবং বিএনপি-জামায়াতপন্থি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে উজাড় হয়ে গেছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট পাথর। এ নিয়ে এক বছরে কোনো সাড়াশব্দ ছিল না ইউনূস সরকারের। যখন দেশজুড়ে এ নিয়ে তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করল, তখন চাপ সামাল দিতে ইউনূস সরকারের জি হুজুর প্রশাসন অভিযানে নেমে উদ্ধার করল মাত্র ১২ হাজার ঘনফুট পাথর। যা মোট লুট হওয়া পাথরের ১ শতাংশেরও কম।

স্থানীয়রা বলছেন—পুরো পাহাড়-নদী সাবাড় করে ফেলার পর কয়েক মুঠো নুড়িপাথর উদ্ধার করে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

জানা যায়, গত বছরের ৫ই আগস্টের পর বিরামহীনভাবে চলছে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের পাথর লুট। সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের শীর্ষে থাকা এই অঞ্চল লুটপাটে ক্ষতবিক্ষত স্পটে পরিণত হয়েছে। পাথরের সঙ্গে বালুও লুট হচ্ছে। অথচ পর্যটনকেন্দ্রের চারদিকে বিজিবির চারটি ক্যাম্প ও পোস্ট রয়েছে।

প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ধলাই নদের উৎসমুখে ভেসে আসা পাথরের বিশাল স্তুপের কারণে প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে তৈরি এ স্থানটি পর্যটন স্পট হিসেবে গত কয়েক বছরে বেশ সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু এখন এটি পরিণত হয়েছে ধু ধু মরুভূমিতে।

আগে এবং পরে, তুলনামূলক চিত্র

হাজার কোটি টাকার পাথর লুট, নীরব প্রশাসন, জনতার ক্ষোভ

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, দিন-রাত শত শত ট্রাক আর ড্রেজার মেশিনের গর্জনে গত এক বছর ধরে সাদাপাথরের বুক চিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হাজার কোটি টাকার প্রাকৃতিক সম্পদ। নদীর স্রোতপ্রবাহ বিনষ্ট করে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে তোলা হয়েছে এসব পাথর। অথচ প্রশাসন নিশ্চুপ ছিল। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পাথর কোয়ারি দখল নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। তবুও সরকার-প্রশাসন ছিল নীরব।

সিলেট নগরী থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো থেকে যে নদীর উৎপত্তি হয়ে ভোলাগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সেই নদীর নাম ধলাই নদ। পাহাড় থেকে ঝর্ণার পানির স্রোতে এই নদী বেয়েই সাদাটে এসব পাথর নেমে আসে। ধলাই নদের উৎসমুখের এই জায়গার নাম ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্ট।

সিলেটের পরিবেশবিদরা জানান, ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি লিজও দেওয়া হয়নি ওই স্থান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গত চার বছরে এখান থেকে কোনো পাথর উত্তোলন করা হয়নি প্রশাসনের নজরদারির কারণে। এখন সব চিচিং ফাঁক হয়ে গেছে। ৫ই আগস্টের পর থেকে মূলত পাথর লুট শুরু। প্রশাসন চোখ বন্ধ করে এতে সম্মতি দিয়ে গেছে।

গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, নৌকায় করে সাদা পাথর তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি গর্ত খুঁড়েও পাথর তুলতে দেখা যায়। জনগণের তীব্র সমালোচনা শুরু হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। পাথর উদ্ধারে অভিযানে নামে তারা। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন। অভিযানে ১২ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ এবং কয়েকটি নৌকা ভাঙ হয়।

তবে স্থানীয়দের মতে, এটি স্রেফ আইওয়াশ। জনরোষ ঠেকাতেই করা হয়েছে। তারা বলছেন, যেখানে কোটি কোটি ঘনফুট উধাও হয়ে গেল, সেখানে মাত্র ১২ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার স্রেফ একটা নাটক।

প্রশাসনের তৎপরতায় উদ্ধারকৃত পাথর

পর্যটন ব্যবসার সাথে যুক্ত স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরে পর্যটন ব্যবসা প্রসারিত হয়েছিল। সারাদেশ থেকে মানুষ আসত এখানে পাথর আর নদীর সৌন্দর্য দেখতে। পাথর ছাড়া এই মরুভূমি দেখতে গত ৫ই আগস্টের পর আর কেউ তেমন আসেন না, ফলে পর্যটন ব্যবসা সম্পূর্ণ ধসে গেছে। এতে কর্মহীন হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। পাথর লুটপাটকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং তাদের দোসর হিসেবে প্রশাসনকে দুষছেন তারা।

লুটপাটে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন চর্মনাই পীর

পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখায় শেখ হাসিনার সরকারের সমালোচনা করে চর্মনাই পীর ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (ইআবা) নেতা সৈয়দ ফয়জুল করিম পাথর ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি উস্কানি দিয়ে বলেন, পাথর তুললে পরিবেশের ক্ষতি হয়, এটা মিথ্যা। এটা ভারতের চক্রান্তে পাথর তোলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। পরিবেশ আইনটি ভারতের নির্দেশেই করা হয়েছে ইত্যাদি।

তিনি পাথর ব্যবসায়ীদের উস্কে দিয়ে সব পাথর তুলে ফেলার ইন্ধন যোগান ওই সভায়।

পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের মন্তব্য

বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, আগের চার বছর জাফলং-এ পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখা গিয়েছিল, তখন আমি রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলাম না। অথচ এখন আমি উপদেষ্টা হয়েও পাথর লুটপাট বন্ধ করতে পারলাম না।

গত ২৬শে জুলাই তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, পাথর তোলার ব্যাপারে সর্বদলীয় ঐক্য দেখছি। একটি সুন্দর জিনিস কী করে হাতে ধরে কেমন অসুন্দর করতে হয় সেটা শিখতে হলে বাংলাদেশে আসতে হবে। চোখের সামনে অপূর্ব সুন্দর একটি জায়গা জাফলং চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখলাম। ধ্বংসলীলা দেখলাম।

অর্থনীতি থেকে পরিবেশ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত

গত বছরের জুলাই-আগস্টে জঙ্গি হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোর পর সারাদেশে অবারিত লুটপাট শুরু করে আন্দোলনে বিজয়ীপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে সাদাপাথরেও শুরু হয় লুটপাট। ২০২০ সাল থেকে সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ থাকা সিলেটের সব কটি পাথর কোয়ারিতে গণলুট শুরু হয়। কয়েক হাজার পাথরশ্রমিক প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন শুরু করেন।

বিএনপি-জামায়াতসহ ইউনূস সরকারের স্টেকহোল্ডার সকল সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত লোকজনের ইন্ধনে ও সরাসরি অংশগ্রহণে এই লুটপাট চলে। শুরুতে অন্য পাথর কোয়ারিতে গণলুট চললেও তুলনামূলকভাবে পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরে লুটপাট কম হয়। তবে গত ২৩শে এপ্রিল থেকে সাদাপাথর এলাকায় আবার পাথর লুট শুরু হয়। গত এক সপ্তাহ দেদার লুটপাট চালিয়ে এলাকাটির প্রায় ৮০ শতাংশ পাথর তুলে ফেলা হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে ধলাই নদের উৎসমুখেই সাদাপাথরের অবস্থান। প্রায় ১৫ একর এলাকাজুড়ে এ পর্যটনকেন্দ্র। ছোট-বড় অসংখ্য পাথরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত জলের স্রোতোধারা এ পর্যটনকেন্দ্রের মূল আকর্ষণ। এই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার পর্যটক ভিড় জমান। এখন পাথর লুট হয়ে যাওয়ায় পর্যটকেরা হতাশ।

লুট হওয়া ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট পাথরের বাজারমূল্য হাজার হাজার কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বিপুল অর্থ।

গণলুটে বিপর্যয়ের মুখে প্রাকৃতিক পরিবেশ

পাথর কোয়ারিতে গণলুটের ফলে নদীর প্রবাহ ব্যাহত, পানির স্তর নেমে যাওয়া, মাটিক্ষয়, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়া—সব মিলিয়ে সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলের অস্তিত্বই সংকটে।

পরিবেশবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই স্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা স্বচ্ছ পানির এ আধার এই এলাকার বেশ কিছু স্থানের খাবার পানির চাহিদা মেটায়।

তিনি বলেন, এই পাথরগুলো যেখান থেকে ন্যাচারালি আসে, সেখান থেকে পানি প্রবাহের ভয়ংকর তোড় তৈরি হয়। পানি প্রবাহের তীব্রতা বেড়ে যায়। যেখানে তোড় বেশি সেখানে পাথর জমে। পাথরের কাজ হয় ওই তোড়ের পানির গতিকে কমিয়ে দেওয়া। এটা একটা প্রাকৃতিক ধাপ। শুধু তাই নয় পানির মধ্যে অক্সিজেন সংশ্লেষ করাও এর কাজ যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘সোলার অ্যাকুয়াটিক ন্যাচারাল প্রসেস অব ট্রিটমেন্ট’ বলা হয়।

প্রকৃতির এই পুরো সিস্টেমে যদি কোন ব্যাঘাত ঘটানো হয় অর্থাৎ পাথর তুলে ফেলা হলে তখন সিস্টেম ভেঙে পড়ে বলে জানান এই পরিবেশবিদ।

তিনি বলেন, এর ফলে দুপাশে প্লাবনের পরিমাণ বাড়ে, ভাঙনের সৃষ্টি হয় এবং পানিটাকে গোড়াতেই সাংঘাতিকভাবে দূষিত করে ফেলে। মনে রাখা দরকার ওই অঞ্চলের অনেক জায়গায় খাবার পানির চাহিদা মেটায় এই পানি।

এসব ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের কারণে প্রকৃতিগতভাবে অন্যান্য ক্ষতি তৈরির অভিঘাত সৃষ্টি হয় বলে মনে করেন তিনি।

Visited 11 times, 1 visit(s) today