শিবিরের ক্ষমা চাওয়া ও প্রক্টরের পদত্যাগসহ ৫ দফা দাবি শিক্ষক নেটওয়ার্কের

শিবিরের ক্ষমা চাওয়া ও প্রক্টরের পদত্যাগসহ ৫ দফা দাবি শিক্ষক নেটওয়ার্কের
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ৭ই আগস্ট, ২০২৫।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে চিহ্নিত ‘গণহত্যাকারীদের’ ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এছাড়াও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছে সংগঠনটি। বুধবার (৬ আগস্ট) এক বিবৃতিতে এই দাবিগুলো তুলে ধরা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি

শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়, টিএসসিতে ৫ আগস্টের এই ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংগঠনটি তাদের পাঁচ দফা দাবিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো তুলে ধরেছে:

১. ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্ষমা চাওয়া: গণহত্যাকারীদের ছবি প্রদর্শনের জন্য ছাত্রশিবিরকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের সম্মানকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং এর জন্য দায়ী সংগঠনটির প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা প্রয়োজন।

২. প্রক্টরের পদত্যাগ: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে এই ঘটনার দায় নিয়ে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঘটনাসহ গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় প্রক্টর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে, তোফাজ্জল ও সাম্য হত্যাকাণ্ড, শেখ হাসিনার গ্রাফিতি মুছে ফেলা, চারুকলায় শোভাযাত্রার মোটিফে আগুন দেওয়া এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আমলে না নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

৩. জড়িতদের শাস্তি: টিএসসিতে রাজাকারদের ছবি প্রদর্শনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষক নেটওয়ার্কের মতে, এ ধরনের কার্যকলাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের প্রতি হুমকি।

৪. ইন্টারনেট ব্যবহারে হয়রানি রোধ: ইন্টারনেট ব্যবহার করে নারীদের হয়রানির সঙ্গে জড়িত সংগঠন বা গ্রুপ এবং তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করা হয়েছে। এই দাবির মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

৫. মুক্তিযুদ্ধের সম্মান রক্ষা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর মুক্তিযুদ্ধের সম্মান রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রশাসন এই দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই আন্দোলনের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন করা হয়, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। শিক্ষক নেটওয়ার্ক এই ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করেছে।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেছে, প্রক্টরের অদক্ষতা ও অক্ষমতার কারণে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেওয়া হয়েছে। তারা দাবি করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের সম্মান রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও, গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, যেমন- হত্যাকাণ্ড, গ্রাফিতি মুছে ফেলা, এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রতি প্রশাসনের উদাসীনতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যান্য সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনার পর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীও জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। এছাড়াও, ছাত্রদল এই ঘটনার প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে তারা শিবিরের কর্মসূচিতে স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শনের সমালোচনা করেছে। তবে, ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে ‘মিথ্যাচার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা কোনো অসৌমজন্য বা স্বাধীনতাবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ছাত্রশিবিরের এই কর্মসূচি নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে। শিক্ষক নেটওয়ার্কের পাঁচ দফা দাবি ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার প্রতি জোর দিয়েছে। এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এই দাবিগুলোর প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ নেয়, তা নিয়ে সবার দৃষ্টি এখন ক্যাম্পাসের দিকে।

Visited 10 times, 1 visit(s) today