ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্কারোপ যুক্তরাষ্ট্রের, মোট শুল্ক ঠেকল ৫০%-এ

ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্কারোপ যুক্তরাষ্ট্রের, মোট শুল্ক ঠেকল ৫০%-এ
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে ভারতের আমদানিকৃত পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত পণ্যের উপর মোট শুল্ক ৫০%-এ পৌঁছেছে, যা চীনের উপর ৩০% এবং পাকিস্তানের উপর ১৯% শুল্কের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই নতুন শুল্ক ২১ দিন পর, অর্থাৎ ২৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। এই পদক্ষেপের পেছনে ভারতের রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয় অব্যাহত রাখাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মার্কিন প্রশাসনের মতে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছে।

শুল্ক আরোপের পটভূমি

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প গত সপ্তাহে ভারতের উপর ২৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। এবার তিনি অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপ করেছেন, যা ভারতের রাশিয়ার তেল এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের বিরুদ্ধে একটি “শাস্তিমূলক” ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, “ভারত সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার তেল আমদানি করছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিদেশ নীতির জন্য অস্বাভাবিক এবং অসাধারণ হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।”

ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেছেন যে ভারত “একটি ভালো বাণিজ্যিক অংশীদার নয়” কারণ তারা মার্কিন পণ্যের উপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে এবং রাশিয়ার সঙ্গে তেল ও অস্ত্র বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। তিনি দাবি করেছেন, এই শুল্ক ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাকে ত্বরান্বিত করবে।

ভারতের প্রতিক্রিয়া

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে “অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য” হিসেবে অভিহিত করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, “ভারতের তেল আমদানি বৈশ্বিক বাজারের পরিস্থিতি এবং ১৪০ কোটি মানুষের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে করা হয়।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশ রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম, প্যালাডিয়াম এবং সারের মতো পণ্য আমদানি করে, যা তাদের জন্য “অত্যাবশ্যক নয়”। ভারত জানিয়েছে, তারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

ভারতের প্রায় ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি বাজারের উপর এই শুল্কের প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে। টেক্সটাইল, রত্ন ও গহনা, অটো যন্ত্রাংশ, এবং সামুদ্রিক পণ্যের মতো খাতগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) এর মতে, এই শুল্কের ফলে ভারতের মার্কিন রপ্তানি ৪০-৫০% কমে যেতে পারে। তবে, ফার্মাসিউটিক্যাল, সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের মতো খাতগুলো এই শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়েছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সরকারের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই শুল্ক এবং রাশিয়ার তেল ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত ১০% জরিমানা শুল্কের ফলে প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা অনুমান করছেন, এই শুল্ক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের জিডিপি-তে ০.২ থেকে ০.৫% হ্রাস ঘটাতে পারে।

বাণিজ্য আলোচনার সম্ভাবনা

ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির (বিটিএ) আলোচনা চলছে, যা আগামী শরতে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত ইতিমধ্যে মার্কিন পণ্যের উপর ২৩ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক হ্রাস করেছে এবং কৃষি, ডিজিটাল পরিষেবা কর, এবং সরকারি ক্রয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো খাতে মার্কিন প্রবেশের বিষয়ে তারা কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে।

বিশ্বব্যাপী প্রভাব

ট্রাম্পের এই শুল্ক নীতি শুধু ভারতের জন্য নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। চীন, ভিয়েতনাম, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশের উপরও ভিন্ন হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ভারতের তুলনায় চীনের উপর ১২৫% এবং ভিয়েতনামের উপর ৪৬% শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই শুল্ক নীতি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন এবং মূল্যস্ফীতির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন।

ভারত এখন কৌশলগতভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তবে, আগামী কয়েক সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ফলাফল এই শুল্কের প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Visited 31 times, 1 visit(s) today