নিজস্ব প্রতিবেদক
গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীর খাঁ পাড়া সড়কে অবস্থিত ‘সিজন ড্রেসেস লিমিটেড’ একসময় দেশের অন্যতম সফল পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অভিঘাতে ২০২৩ সালে প্রথম ধাক্কা সামলেও গতি স্বাভাবিক ছিল কারখানাটির। কিন্তু গত আগস্টের সংঘাতের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা-অব্যবস্থাপনায় বড় ধাক্কা আসে ব্যাংকিং খাত থেকে।
ঋণের কিস্তি আগের ৮ শতাংশের পরিবর্তে দ্বিগুণ হারে কেটে নিতে শুরু করে ব্যাংকগুলো। মালিকপক্ষের আবেদন-নিবেদনেও ব্যাংক থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি। শ্রমিকদের মজুরি, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলসহ নানা খরচ তুলতে না পেরে চরম সংকটে পড়ে দেশসেরা প্রতিষ্ঠানটি। বাড়তে থাকে বকেয়া, শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ৪০ কোটি টাকার কার্যাদেশ বাতিল করে দেন বিদেশি ক্রেতারা।
বাধ্য হয়ে মালিকপক্ষ কারখানার যন্ত্রাংশ ও কাপড় বিক্রি করে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করে। এরপর ৭০ কোটি টাকার ঋণের দায়ে ব্যাংক মামলা করলে গত মাসে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় সিজন ড্রেসেস। কর্মহীন হয়ে পড়েন প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ২৬০ শ্রমিক-কর্মচারী।
সিজন ড্রেসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাহাউদ্দিন চৌধুরী বাকের বলেন, ‘আমি সফল ব্যবসায়ী ছিলাম। ব্যাংক আগের নিয়মে টাকা নিলে এই পরিণতি হতো না। শ্রমিক অসন্তোষ হতো না, অর্ডার বাতিল হতো না। ২৮ বছরের ঘামে-শ্রমে গড়া প্রতিষ্ঠানটা শুধু ব্যাংকের অসহযোগিতায় শেষ হয়ে গেল।’
শুধু সিজন ড্রেসেস নয়, গাজীপুরে শিল্প খাতের ধস এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ বছরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে মাত্র ৬ মাসেই বন্ধ হয়েছে ২৯টি কারখানা। এসব কারখানার অধিকাংশই ছিল রপ্তানিমুখী, বিজিএমইএভুক্ত এবং বড় মাপের প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকোর ১৬টি ইউনিট, মাহমুদ জিন্স, ডার্ড কম্পোজিট, লা-মুনি অ্যাপারেলস, কেয়া গ্রুপসহ অনেক নামীদামি প্রতিষ্ঠান।
এতে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৭৩ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। শুধু বেক্সিমকোরই রয়েছে ৪২ হাজারের বেশি শ্রমিক। বহু শ্রমিক বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন, কেউবা ফিরে গেছেন গ্রামে।
আরকেএম অ্যাপারেলস বন্ধ হয়ে যায় গত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে। এতে চাকরি হারান ২৬০ শ্রমিক।
এই কারখানার অপারেটর রংপুরের পীরগাছার শেফালী বেগম চাকরি না পেয়ে বাসাবাড়ির ঝিয়ের কাজ খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী অসুস্থ, তিন সন্তান লেখাপড়া করে। সংসারের সব খরচ আমার আয়েই চলত। এখন কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।’
একইভাবে স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকের ফোরম্যান আসকর হোসেন বলেন, ‘একসময় যে প্রতিষ্ঠান গর্বের ছিল, আজ তা দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছয় মাস চাকরি খুঁজেও পাইনি। এখন ভাড়ায় ইজি বাইক চালাই, তাও সংসার চলে না।’
এই সংকট শুধু শ্রমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, গাজীপুরের স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়েছে এর ভয়াবহ প্রভাব। চক্রবর্তী এলাকার বাসিন্দা ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষই শ্রমিকদের বাড়িভাড়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন ঘর ফাঁকা, দোকানে ক্রেতা নেই, ব্যাংকঋণে নির্মিত বাড়িগুলো আজ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নতুন করে চাকরি পাওয়ার সুযোগ প্রায় নেই। বরং প্রতিদিনই নতুন করে ছাঁটাইয়ের খবর আসছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কোনো বড় ধরনের পরিকল্পনা নেই সরকারের পক্ষ থেকে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব, ব্যাংক খাতের অসহযোগিতা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতার ফলে গাজীপুরের পোশাক শিল্প এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। দেশের বৈদেশিক রপ্তানির বড় অংশ জোগানদাতা এই খাতকে ঘিরে যে কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, তা আজ হুমকির মুখে।
