নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানি খাতে ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন বাজারে শুল্ক হ্রাস সত্ত্বেও ভিয়েতনামের কৌশলগত সুবিধা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এই ব্যবধানের মূল কারণ।
শুল্ক নীতি ও বাজার প্রতিযোগিতা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রিসিপরোকাল শুল্ক নীতিতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫% থেকে কমে ২০% এ এসেছে, তবে ১৫% রেগুলার শুল্ক যোগে মোট শুল্ক ৩৫%। ভিয়েতনামের রিসিপরোকাল শুল্ক ৪৬% থেকে ২০% এ নেমেছে, ৭.৫% রেগুলার শুল্ক যোগে মোট ২৭.৫%। এই শুল্ক হ্রাস ভিয়েতনামকে বাংলাদেশের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
২০০০ সালে ভিয়েতনামের মোট রপ্তানি ছিল ১৪.৫ বিলিয়ন ডলার, যার ৩০% (৪.৩৫ বিলিয়ন) ছিল গার্মেন্টস। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ৫.৪ বিলিয়ন ডলার, যার ৫৫% (২.৯৭ বিলিয়ন) ছিল গার্মেন্টস। ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের মোট রপ্তানি ৪০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার ৯% (৩৬.৪৫ বিলিয়ন) গার্মেন্টস, আর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার ৮৬% (৪১.২৮ বিলিয়ন) গার্মেন্টস।
যদিও বাংলাদেশ গার্মেন্টস রপ্তানির পরিমাণে এগিয়ে, ভিয়েতনামের বৈচিত্র্যময় রপ্তানি ও উচ্চমূল্যের পণ্য তাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে।
কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?
ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ভিয়েতনাম ২০১৯ সালের ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং কম শুল্কের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফরমাল পোশাক, জ্যাকেট ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশ মূলত কম দামের ক্যাজুয়াল পোশাক, যেমন টি-শার্ট ও সোয়েটারে সীমাবদ্ধ।
দ্বিতীয়ত, ভিয়েতনাম স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ এখনো চীন থেকে আমদানি-নির্ভর। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, শ্রম অস্থিরতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ ২৫টি বোয়িং বিমান, বিলিয়ন ডলারের গম ক্রয় চুক্তি এবং উচ্চমানের উপদেষ্টাদের মেধা কাজে লাগিয়েও ভিয়েতনাম, ব্রাজিল বা পাকিস্তানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। পাকিস্তানের ১৯% শুল্ক ও স্থানীয় তুলার সুবিধা থাকলেও, তাদের উৎপাদন অবকাঠামো দুর্বল। ব্রাজিলের শুল্ক ১০%, কিন্তু গার্মেন্টস রপ্তানি তুচ্ছ। ভিয়েতনামের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বৈচিত্র্যকরণই তাদের এগিয়ে রেখেছে।
সম্ভাবনা ও পথচলা
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প, যা ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও রপ্তানির ৮০% এর বেশি যোগায়, প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকতে পরিকল্পনা করছে। শিল্পোদ্যোক্তারা পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় ফিরতে চান।
বিজিএমইএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, “বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে আমরা চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের সুযোগ কাজে লাগাতে পারি।”
২০২৬ সালে এলডিসি মর্যাদা হারানোর পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে ৭.৭৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধি, টেকসই উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।
জনগণের প্রতি বার্তা
গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের প্রতি সরকার ও শিল্প নেতাদের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। জনগণকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, শুল্ক ও প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে টিকে থাকবে।
