নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২১ জুলাই ২০২৫
আজ দুপুরে মাইলস্টোন কলেজ ক্যাম্পাসে একটি ছোট বিমান দুর্ঘটনার ঘটনায় লাখো উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় করেছে। দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখতে, ছবি তুলতে এবং ভিডিও রেকর্ড করতে ছুটে আসা এই জনতার কারণে উদ্ধারকারী দলের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই ঘটনা শুধুমাত্র মাইলস্টোন কলেজের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজে যেকোনো দুর্ঘটনা বা ঘটনার সময় জনতার অতি-উৎসাহী আচরণের একটি বড় সমস্যাকে সামনে এনেছে, যা তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
উৎসুক জনতার ভিড়ে উদ্ধার কার্যক্রমে বাধা মাইলস্টোন কলেজের কাছে বিমান দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হন। অনেকে স্মার্টফোন হাতে ভিডিও ধারণ করতে এবং ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যেন কোনো সিনেমার শুটিং চলছে। ইনফ্লুয়েন্সার, টিকটকার হতে চাওয়া ব্যাক্তিরা ভিউয়ার বাড়াতে সোষ্যাল মিডিয়ায় লাইভ ব্রডকাস্ট করছেন। মানুষের মৃত্যু ভিউ বাড়ানোর উপলক্ষ্য এনে দিয়েছে যেন।
এই উৎসুক জনতার ভিড়ের কারণে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং অন্যান্য জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বিলম্বের সম্মুখীন হয়। ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং সম্ভাব্য আহত ব্যক্তিদের জীবন রক্ষার জন্য দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। একজন ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু জনতার ভিড়ের কারণে আমাদের গাড়ি আটকে যায়। এমন অবস্থায় উদ্ধার কার্যক্রম চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই ধরনের আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, উতসুক লোকজনের ভীড়ের কারনে অটোরিকশা চলাচলের জায়গা সীমিত, উদ্ধারকারীরা আহতদের প্রচন্ড কষ্ট করে, কোলে, হাতে করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের সমাজে একটি দীর্ঘদিনের সমস্যাকে তুলে ধরেছে—দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক ঘটনার প্রতি জনগণের অতি কৌতূহল। দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় করে ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ করা এবং সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার প্রবণতা এখন একটি সাধারণ দৃশ্য। হয়তো অফিস শেষে বিকালের দিকে ভীড় আরো বাড়োবে। আশে পাশে মার্কেট, ফুড কোর্টে সময় কাটাতে না গিয়ে মানুষজন তথ্য সংগ্রহে চলে যাচ্ছে মাইলস্টোন কলেজ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আচরণ শুধুমাত্র উদ্ধার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে না, বরং এটি মানবিক সংবেদনশীলতার অভাবকেও প্রকাশ করে। স্থানীয় সমাজকর্মী ফারজানা আক্তার বলেন, “একটি দুর্ঘটনা যেখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত, সেখানে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার মানসিকতা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার যে, এই ধরনের আচরণ জীবনহানির কারণ হতে পারে।”
তীব্র সমালোচনা ও প্রতিকারের প্রয়োজনীয়তা এই ধরনের ঘটনা সমাজে দায়িত্বশীল আচরণের অভাব এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকে তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ও প্রচারণা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাসেল মাহমুদ বলেন, “আমরা যদি একটু সচেতন হই, তাহলে উদ্ধারকারী দলগুলো তাদের কাজ দ্রুত করতে পারে। আমাদের উৎসুকতা কারও জীবনের মূল্য হওয়া উচিত নয়।”
পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, “আমরা জনগণের কাছে অনুরোধ করছি, দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় না করে উদ্ধারকারী দলগুলোকে তাদের কাজ করতে সহযোগিতা করুন। এটি জরুরি পরিষেবাগুলোর কার্যকারিতা বাড়াবে এবং জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে।”
সমাধানের পথ এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। স্কুল-কলেজে দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ শিক্ষা, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা এবং দুর্ঘটনাস্থলে জনতার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এছাড়া, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে উৎসুক জনতার ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মাইলস্টোন কলেজের বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা আমাদের সমাজের একটি গুরুতর সমস্যাকে সামনে এনেছে। এই অতি কৌতূহলী মানসিকতা এবং দায়িত্বহীন আচরণ বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। সমাজ হিসেবে আমাদের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে।
