নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সাধারণ মানুষ। খুন, চুরি, হামলা বেড়েই চলছে।
রাজনৈতিক সংঘর্ষ, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, বালু ও মাটি ব্যবসার দখল এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছে, যার ফলে একদিকে প্রাণহানি, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতার বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছে জনজীবন। চাঁদাবাজির মচ্ছব চলছে এলাকায়।
৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর এখানে বিএনপির কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠে। বিএনপি নেতা কুখ্যাত রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর পুত্র হুম্মাম কাদের (হুকা) চৌধুরী গ্রুপ, বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন (গিকা) কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীরা রাউজানে আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজাকার সাকার পুত্র হুকার ইন্ধনে ও নির্দেশে চলেছে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড। বিএনপি নেতারা নিজেদের স্বার্থে আধিপত্য ধরে রাখতে কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করছেন। সন্ত্রাসীদের ওপর নেতার ছায়া থাকায় পুলিশ প্রশাসনও অনেকটা অসহায়। রাউজানে খুনোখুনির ঘটনায় অভিযোগের দায় নিয়ে বিএনপির নেতারা পরস্পরকে দায়ী করেছেন।
৫ই আগস্টের পর রাউজানে এক বছরে কয়েক ডজন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই রাজনৈতিক কারণে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের কয়েকজন নেতা খুনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া বিএনপির দলীয় কোন্দলেও খুন হয়েছেন কয়েকজন।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ৬ই জুলাই বোরকা পরা একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী একটি বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে মুহাম্মদ সেলিম নামের (৪০) এক যুবদল নেতাকে। তিনি উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সমশের পাড়া গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে।
কদলপুর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব ছিলেন সেলিম। চাচির জানাজা শেষে স্ত্রী-শিশু সন্তানসহ মোটরসাইকেলে ওষুধ কিনতে গিয়েছিলেন তিনি। তাদের সামনেই বোরকা পরা একদল সশস্ত্র যুবক সেলিমকে গুলি করে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়। বালুমহালের দখলদারিত্ব নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
৫ই আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পরই রাতারাতি অসংখ্য মানুষ হামলার শিকার হন। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের সাথে জড়িত এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসে নরক। সেসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অকার্যকর থাকায় কোনো রেকর্ড পর্যন্ত নেই কত মানুষ আহত, নিহত, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। পুরো জনপদে রক্তের হোলি খেলা শুরু হয়।
কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো:
২৮শে আগস্ট বিকেলে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে (২৮)। তিনি বেতবুনিয়া সুগারমিল ডাকবাংলো এলাকার কবির আহাম্মদের ছেলে।
১লা সেপ্টেম্বর সাবেক সংসদ-সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে আওয়ামী লীগের কর্মী মো. ইউসুফ মিয়ার (৬৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত ইউসুফ রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল শুক্কুর মিয়ার বাড়ির মৃত শামসু মিয়ার ছেলে। তাকে রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে।
২৯শে অক্টোবর নিখোঁজের ৪ দিন পর মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মইশকরম এলাকা থেকে পুলিশ অর্ধগলিত একটি লাশ উদ্ধার করে। এই লাশটি ছিল আজম খানের (৫২)।
১১ই নভেম্বর নিখোঁজের ৩ দিনের মাথায় রক্তাক্ত অবস্থায় হাফেজ মাওলানা আবু তাহের (৪৮) নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি রাউজানের চিকদাইর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আকবর শাহ (রহ.) বাড়ির মৃত আবদুল মান্নানের ছেলে। রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে জানান স্থানীয়রা।
২৪শে জানুয়ারি উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকায় গ্রামের বাড়িতে জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নগরীর খাতুনগঞ্জের আড়তদার মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫৫)। তিনি শহর থেকে মোটরসাইকেলে বাড়িতে গিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর আলম নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নিরামিশপাড়ার মৃত আবু ছৈয়দ মেম্বারের ছেলে। তাকে স্থানীয় যুবদল সন্ত্রাসীরা খুন করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
১৯শে ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ হাসান (৩৫) নামে এক যুবলীগ কর্মীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে বিএনপির সন্ত্রাসীরা। নিহত হাসান নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আহমেদ হোসেন মেম্বারের বাড়ির মো. বজল আহমেদ ড্রাইভারের ছেলে। তাকেও রাজনৈতিক বিরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
১৫ই মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের মারধর ও ছুরিকাঘাতে খুন হন কমর উদ্দিন জিতু (৩৬) নামে এক যুবদল কর্মী। জিতু হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্ত্তা গ্রামের মুহাম্মদ আলীর ছেলে।
২১শে মার্চ পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হোয়ারাপাড়া এলাকার মোবারক খালের পূর্ব পাশে খোলা জমি থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় মো. রুবেল (৩৫) নামে এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গরু চোর সন্দেহে তাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহত রুবেল নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকার মৃত নুরুল আলমের ছেলে।
৪ঠা এপ্রিল পারিবারিক দ্বন্দ্বে মায়ের পেটের দুই ছোট ভাইয়ের ধারালো অস্ত্র ও লোহার রডের আঘাতে খুন হন বড় ভাই প্রকৌশলী মো. নূর আলম বকুল (৪৩)। তিনি রাউজান উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের ইয়াসিন নগর গ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মো. মুছার ছেলে।
১৭ই এপ্রিল রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের মাহামুনি দিঘী থেকে মো. জাফর (৪০) নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত জাফর রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের মো. ইব্রাহিমের ছেলে। তাকে হত্যা করে দিঘীর পানিতে লাশ ফেলে দেওয়া হয়।
১৯শে এপ্রিল রাতে খুন হন যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহ (৩৬)। ১৫ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী এসে ভাত খাওয়া অবস্থায় তার মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
২২শে এপ্রিল রাউজান উপজেলা সদরের কাছে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গাজিপাড়া গ্রামে খুন হন ইব্রাহিম (২৮) নামের এক যুবদল কর্মী। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আলম।
২৫শে জুন রাউজানে বালু দিয়ে মস্তক এবং গাছের পাতা দিয়ে শরীর ঢাকা অবস্থায় রুপন নাথ (৪২) নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের যুগীপাড়ার কর্ণফুলী নদীর পাড়ের বোট ঘাটা এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। রুপন বাগোয়ান ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম নাথ পাড়ার ননী গোপাল নাথের ছেলে।
৩রা জুলাই ধূমপান করাকে কেন্দ্র করে মারামারিতে লিপ্ত হয় এলাকার কিশোরদের দুটি পক্ষ। তা থামাতে গিয়ে ঘুসিতে আলমগীর নামে এক যুবদল নেতা নিহত হন। তিনি উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
৬ই জুলাই কদলপুরে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মুহাম্মদ সেলিমকে (৪০)।
এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর মধ্যে হামলা-মারামারিতে আহত হয়েছেন আরও কয়েকশ লোক। যাদের অনেকে আহত কিংবা পঙ্গুত্ব নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ই আগস্টের পর থেকে এলাকায় রক্তের বন্যা বইছে। আওয়ামী লীগের লোকজন এলাকায় নেই। বাড়িঘরে যেতে পারেন না। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফেরেন মানুষ। এই খুনোখুনির কারণে অনেকেই আর শহর ছেড়ে যান না গ্রামের বাড়িতে। কোনো কোনো পরিবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে এসেছেন শহরে।
এছাড়াও রাতের অন্ধকারে চুরি হয়ে যাচ্ছে সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, গরু, দোকানের মালামাল ও বসতবাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের মতে, এসব হত্যাকাণ্ড বা অপরাধ বিচ্ছিন্ন নয় বরং এগুলো রাজনৈতিক আধিপত্য, প্রভাব বিস্তার ও পেশিশক্তির একটি সুপরিকল্পিত ধারাবাহিকতা।
অনেকেই অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফলে সাধারণ মানুষ আইনের আশ্রয় নেওয়ার বদলে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে যেতে ভয় লাগে। কে কখন কী হয়ে যাবে, বলা যায় না। পুলিশও অনেক সময় কিছু করতে পারে না বা করে না।”
রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু করেছি। এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক সভাও করা হচ্ছে যাতে জনগণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করে।
তবে স্থানীয়রা মনে করেন, শুধু অভিযান বা সভা নয়—প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছাড়া এই সহিংসতা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তারা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগের জোর দাবি জানান। পাশাপাশি চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
