জয় আদিত্য
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলেই মুখোশধারী জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটির অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা চরমপন্থী ও জামায়াতপন্থী ব্যক্তিরা একে একে চিহ্নিত হচ্ছেন। ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চালানো শিবির-সম্পৃক্ত নেতাদের নাম প্রকাশ্যে আসছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে- বিএনপির অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াত-শিবিরের মুখোশ কবে উন্মোচিত হবে?
ঢাবিতে ছাত্রলীগের ছায়াতলে শিবিরের ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বিশেষভাবে আলোচিত। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট অনেকেই এক দশকের বেশি সময় ধরে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করে গেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে, বিশেষ করে কবি জসিম উদ্দিন হল, শহীদুল্লাহ হল এবং স্যার আফসার উদ্দিন হলে, এমন নেতাদের উপস্থিতির প্রমাণ একাধিক সূত্রে মিলেছে—যারা অতীতে শিবির করতেন, পরে ছাত্রলীগে যুক্ত হয়ে সাংগঠনিক সুবিধা ভোগ করেন।
একজন প্রাক্তন ডাকসু প্রতিনিধি বলেন, “নাম বললে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের বহু কর্মী সমর্থক ও নেতা আছেন, যাদের অতীত শিবির সংশ্লিষ্টতা দলীয় ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে। এখন তারা সামাজিক মাধ্যমে ধর্মীয় মৌলবাদের পক্ষে কথা বলছেন, ছাত্রলীগের নামেই।”
তাদের কেউ কেউ ফেসবুকে এখনও কট্টর ইসলামপন্থী পোস্ট করেন। আবার কেউ ‘ইসলামী আন্দোলন’ ঘরানার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করেছেন।
যেখানে ছাত্রলীগের মতো সংগঠনে জামায়াতপন্থীদের অনুপ্রবেশ সম্ভব হয়েছে, সেখানে জামায়াতের একসময়ের রাজনৈতিক জোটসঙ্গী বিএনপির অভ্যন্তরে মুখোশধারীরা যে আরও গভীরে ঢুকে রয়েছে, তা রাজনীতির খোলা পর্দার বাইরে না থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায়নি।
বিএনপির একাধিক তৃণমূল ও জেলা পর্যায়ের নেতা জামায়াতপন্থীদের নিয়ে দ্বিধান্বিত অবস্থান প্রকাশ করেছেন। দল পুনর্গঠনের কথা বললেও জামায়াত সংশ্লিষ্টদের কীভাবে চিহ্নিত করা হবে, তা নিয়ে দলটির ভেতরে কোনো স্পষ্টতা নেই।
নেতা-কর্মীদের আশঙ্কা ও হতাশা
একজন জেলা ছাত্রদল নেতা বলেন, “আমরা রাজপথে কাজ করি, কিন্তু অনেকে আছে যারা ২০১২-১৩ তে শিবির করতো, এখন বিএনপির ছায়ায় উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে যদি বিএনপি সামনে আসে, এদের দমন না করলে আবার সেই কট্টর আদর্শ সামনে চলে আসবে।”
অন্যদিকে এক সময়ের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত থাকা এখনকার বিএনপি যুবদলের এক নেতা বলেন, “রাজনীতি তো বাস্তবতা মেনে চলে। কেউ যদি আগে শিবিরে থেকেও এখন গণতন্ত্র চায়, তাতে দোষ কোথায়?”—এই বক্তব্যই স্পষ্ট করে দেয় আদর্শের জায়গায় কতটা ধূসরতা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আদর্শিক স্বচ্ছতা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। ছাত্রলীগে শিবির অনুপ্রবেশের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আদর্শের নামে কতটা সুবিধাবাদ চলছে। বিএনপিও যদি আদর্শগত অবস্থান স্পষ্ট না করে, তারাও একই ফাঁদে পড়বে।
আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টরা যেভাবে অনুপ্রবেশ করেছিল, তা এখন প্রকাশ্যে এসেছে। ঢাবি ছাত্ররাজনীতির উদাহরণ তার সবচেয়ে জ্বলন্ত প্রমাণ। এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন—বিএনপি তাদের ভেতরের মুখোশধারীদের কখন চিহ্নিত করবে? রাজনীতিতে মুখোশধারীদের স্থান কতটা নিরাপদ, সেটি নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নৈতিকতা।
লেখক পরিচিতি: গণমাধ্যমকর্মী
