নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক সমালোচনা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ— ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা ভিত্তিহীন মামলাটি, যা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই ইস্যু ঘিরে বাংলাদেশ–যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ওপর ছায়া পড়েছে। ব্রিটিশ বার্ষিক সাহায্য কমানোর সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক স্তরে হতাশা— সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, একটি বিতর্কিত মামলার মূল্য বাংলাদেশকে বড় আর্থিক ও কূটনৈতিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে না তো?
২০২৫ সালের মে মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা এক মামলায় টিউলিপ সিদ্দিকসহ তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ‘প্রভাব খাটিয়ে’ প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে:
- তাঁরা পূর্বাচলের ডিপ্লোম্যাটিক জোনে ৬টি ১০-কাঠার প্লট পেয়েছেন
- বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে
- একটি ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ভুয়া নোটারির মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়েছে
এই মামলার ভিত্তিতে ঢাকার একটি আদালত টিউলিপের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলাকে সম্পূর্ণ “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” ও “অসত্য” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী,
“এই অভিযোগ কল্পনাপ্রসূত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার।”
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইন্ডিপেনডেন্ট এথিক্স অ্যাডভাইজর বিষয়টি তদন্ত করে টিউলিপকে নির্দোষ ঘোষণা করে দায়মুক্তি দিয়েছেন। এমনকি মামলা দায়েরের আগেই তাঁর আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন— দুদক তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, কোনো তথ্যও দেয়নি।
বিবিসির জিজ্ঞাসায় মুখে তালা, বিপাকে ইউনূস
ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিবিসির ‘দ্য ওয়ার্ল্ড টুনাইট’ অনুষ্ঠানে সঞ্চালক রাজিনি বৈদ্যনাথন টিউলিপ মামলার বিষয়ে একাধিকবার সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেন। তবে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস একটিও নির্দিষ্ট প্রমাণ বা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তার বক্তব্য ছিল শুধুই, “এটি একটি চলমান আইনি প্রক্রিয়া। আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না।”
অন্যদিকে, তিনি এটাও বলেননি যে দুদককে প্রমাণ প্রকাশ করতে বা স্বচ্ছ হতে বলা হবে কিনা। তার এই নিষ্ক্রিয়তা ও ইচ্ছেকৃত উদাসীনতার কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন— “একজন ব্রিটিশ এমপির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে অথচ দায়ী রাষ্ট্রনায়ক কিছুই জানেন না—এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য উন্নয়ন সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এই সিদ্ধান্তের পেছনে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন ব্যয় ও যুদ্ধসংক্রান্ত খরচ অন্যতম কারণ হলেও, টিউলিপ ইস্যু ও বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অস্বস্তি এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে বলেই কূটনৈতিক মহলের অভিমত।
টিউলিপ সিদ্দিকের মামলাটি এখন আর কেবল একটি দেশীয় দুর্নীতি মামলা নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক বার্তা— যেখানে একটি পশ্চিমা দেশের এমপিকে, যিনি আবার ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের জাতির পিতার পরিবারের সদস্য, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মাঝে অস্বস্তি ও ক্ষোভ বাড়ছে এ নিয়ে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনি নিরপেক্ষতা ও বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যা ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার হুমকি বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে। একটি প্রতিহিংসার মামলার দায় পড়ছে পুরো দেশের ওপর।
ইউনূস সরকার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বললেও, টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে রক্ষার পরিবর্তে আরও বিপাকে ফেলছে। ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে ভিন্নমত তৈরি হওয়া, সাহায্য হ্রাসের প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের সঙ্গে নীতিগত দূরত্ব—সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে, “ভিত্তিহীন মামলার রাজনীতি” এখন কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই নয়, বরং বৈদেশিক মিত্রদের আস্থা হারানোর প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে।
