টিউলিপের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তি কী, বিবিসির প্রশ্নে নিরুত্তর ইউনূস

টিউলিপের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তি কী, বিবিসির প্রশ্নে নিরুত্তর ইউনূস
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

লন্ডন সফরে গিয়ে বিবিসির এক সরাসরি সাক্ষাৎকারে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে একের পর এক প্রশ্নবানে জর্জরিত হন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। প্রায় ১৫ মিনিটের এই সাক্ষাৎকারে বারবার আইনি প্রক্রিয়ার কথা বললেও, উপস্থাপিত অভিযোগের খুঁটিনাটি বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, লেবার পার্টির এমপি ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তার যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয়ের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিবিসির The World Tonight অনুষ্ঠানে সঞ্চালক রাজিনি বৈদ্যনাথন প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন, কেন ইউনূস ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠক করতে পারলেন না—যেখানে সফরটিকে ‘সরকারি’ বলা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব আসে টিউলিপ সিদ্দিক প্রসঙ্গে। রাজিনি সরাসরি উল্লেখ করেন, “টিউলিপ সিদ্দিক আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন, চিঠিও দিয়েছেন। আপনি দেখা করবেন?” উত্তরে ইউনূস বলেন, “না, আমি দেখা করবো না। এটা একটি আইনি প্রক্রিয়া। আমি তাতে হস্তক্ষেপ করতে চাই না।”

সঞ্চালক পাল্টা প্রশ্ন তোলেন: “কিন্তু ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এথিক্স অ্যাডভাইজর তো তদন্ত করে তাকে নির্দোষ বলেছেন, দুদকও কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তাহলে তদন্ত চলছে কেন?” জবাবে ইউনূস বলেন, “এটা আদালতের সিদ্ধান্ত। আদালত বিবেচনা করবে মামলাটি চলবে কি না।”

বিবিসির উপস্থাপক একাধিকবার জানতে চান— যেহেতু তিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানে আছেন, তাহলে তিনি কি দুদককে এখন প্রমাণ প্রকাশ করতে বলবেন? ইউনূস বলেন, “আমি দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর আস্থা রাখি।”

তবে প্রশ্ন ছিল সরাসরি— টিউলিপ বলছেন তার আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি, কোনোরূপ প্রমাণ দেখানো হয়নি। এতে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ। ইউনূস এর উত্তরে বলেন, “আইনজীবী বনাম আইনজীবীর মধ্যে বিষয়টি নির্ধারিত হবে।” তবে বিবিসির যুক্তি ছিল— বিষয়টি শুধুই আদালতের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাজনৈতিকভাবেও গভীর বার্তা বহন করে।

টিউলিপের পাল্টা বিবৃতি: আমি অপপ্রচারের শিকার

সাক্ষাৎকারের শেষভাগে বিবিসি জানায়, তারা টিউলিপ সিদ্দিকের প্রতিক্রিয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিল। তিনি সাক্ষাৎকারে অংশ নেননি, তবে লিখিত বিবৃতি পাঠান। তিনি বলেন:

 “ড. ইউনূস আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি না হয়ে আমি হতাশ। তিনি এক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কেন্দ্রে আছেন, যার ভিত্তি কল্পনাপ্রসূত অভিযোগ। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। আমি আশা করি, তিনি এখন অপপ্রচার বন্ধের দিকে মনোযোগ দেবেন।”

টিউলিপের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ কী?

টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি ঢাকার পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একটি প্লট সরকারের বিশেষ ছাড়ে (allegedly undue influence) বরাদ্দ পেয়েছেন। ২০২৫ সালের শুরুতে দুদক এই অভিযোগ তদন্তে নেয় এবং একটি মামলায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইন্ডিপেনডেন্ট এথিক্স অ্যাডভাইজর এই বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করেন এবং কোনো অনিয়মের প্রমাণ না পেয়ে টিউলিপকে দায়মুক্তি দেন।

লন্ডনে বসবাসরত প্রভাবশালী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সমাজের একাংশ মনে করছে, এই অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিশেষত, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ কাউকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিব্রত করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলাটি উস্কে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠছে।

প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ার অজুহাত

সাক্ষাৎকারে ইউনূস দাবি করেন, তিনি কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময় মেলেনি। এ বিষয়ে সঞ্চালক রাজিনির মন্তব্য ছিল, “আপনি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা— তার সমমর্যাদার ব্যক্তি। যুক্তরাজ্যে ১০ লাখ বাংলাদেশি বাস করে। আপনি হতাশ নন?” ইউনূস উত্তর দেন, “আমি জানি না আমি হতাশ হব, নাকি তিনি।”

এই বক্তব্য নিয়েও পরে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা হয়। কারণ একজন সরকারপ্রধানের এই সফরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি অনেক প্রশ্ন তোলে।

সাক্ষাৎকারের শেষভাগে ব্রিটিশ সাহায্য কমে যাওয়ার প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। ইউনূস বলেন, “ব্রিটিশ সাহায্যে কাটছাঁট, এটা একটা বড় ধাক্কা। তবে আমরা নিজেদের প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে থাকব।”

কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া খুবই সাধারণ ও কূটনৈতিকভাবে নিরাপদ বলেই মনে করেছেন বিশ্লেষকেরা।

দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা— এই তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে লন্ডন সফরে গিয়েছিলেন ড. ইউনূস। কিন্তু বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমের সামনে এই প্রশ্নগুলোতেই তিনি পরপর ব্যর্থ হন।

একদিকে কূটনৈতিক সাফল্যের ঘাটতি (প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ না হওয়া), অন্যদিকে বিতর্কিত একটি মামলায় নিরপেক্ষ অবস্থান না নেওয়া— সব মিলিয়ে এই সফর ইউনূসের জন্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ‘আত্মবিশ্বাসের বদলে অসহায়ত্বের’ ছবি ফুটিয়ে তোলে।

Visited 18 times, 1 visit(s) today