এবার জুলাই আন্দোলনকারীদের হিটলিস্টে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সিইও

এবার জুলাই আন্দোলনকারীদের হিটলিস্টে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সিইও
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম বর্তমানে একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে জুলাই আন্দোলনের (২০২৪) প্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা হুমকি, ভাঙচুর এবং চাকরিচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। সর্বশেষ ঘটনায়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সিইও শামসুর রহমান মোমেন জুলাই আন্দোলন নিয়ে ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে ডকুমেন্টারি তৈরি করে হুমকির মুখে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, যারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে উগ্রবাদী গ্রুপ “জুলাই রেভ্যুলুশন” নামে একটি ফেসবুক পেইজ থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের তালাশ টিমের তৈরি একটি ডকুমেন্টারি জুলাই আন্দোলনকে “সন্ত্রাসী” কার্যকলাপ হিসেবে চিত্রিত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, এই ডকুমেন্টারি শামসুর রহমান মোমেনের নির্দেশে তৈরি হয়েছে, এবং এর ইংরেজি ভয়েসওভার করেছেন তাঁর স্ত্রী। তাদের দাবি, এই ভিডিওটি বিশ্বের বিভিন্ন দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন আদায় করা যায়। শামসুর রহমান মোমেন বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, এবং এই পোস্টের মাধ্যমে কার্যত ইন্ডিপেন্ডেট টিভি’র প্রতি মব লেলিয়ে দেয়া হয়েছে, এবং এটাই প্রথম না, এর আগেই এভাবে মব লেলিয়ে অনেক সংবাদ মাধ্যমের কন্ঠরোধ করা হয়েছে।

ধারনা করা হচ্ছে এই তথ্যগুলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির সাংবাদিকরাই পৌছে দিয়েছে উগ্রবাদী এই সকল পেইজ গুলোর হাতে। তথ্য মন্ত্রনালয় সংবাদ মাধ্যমের উপর মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রনে কার্যত কোন ভূমিকার নেয় নি, বরং সহযোগীতা করছে।

জুলাই আন্দোলনের পর থেকে সাংবাদিকদের উপর হুমকি ও হামলার ঘটনা বেড়েছে। আন্দোলনকারীরা, বিশেষ করে ছাত্র গোষ্ঠী, আন্দোলনকারীদের “ন্যারেটিভের” বাইরে কোনো রিপোর্টিং করলে সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছে। সম্প্রতি চারজন সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন, কারণ তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীকে “অস্বস্তিকর” প্রশ্ন করেছিলেন। রাহমান মিজান (দীপ্ত টিভি) এবং ফজলে রাব্বি (এটিএন বাংলা) তাদের পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছেন, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এছাড়া, আন্দোলনের বিরুদ্ধে লেখালেখি করলে সংবাদপত্রের অফিসে জনতা হামলা চালাচ্ছে, ভাঙচুর করছে এবং আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে, এবং শ্যামল দত্তকে দেশ ত্যাগে বাধা দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, কালের কণ্ঠ, রেডিও ক্যাপিটাল এবং ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে, এই হামলাগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং, সরকার এবং তথ্য মন্ত্রণালয় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার, মামলা এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একাত্তর টিভির সাংবাদিক ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন, যা তাদের আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে দেখানোর প্রচেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

ইন্ডিয়ান রিসার্চ অ্যান্ড রিপোর্টিং এজেন্সি (আরআরএজি) জানিয়েছে, ইউনুস সরকারের অধীনে গত আট মাসে ৬৪০ জন সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ইতিহাসে “অভূতপূর্ব” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মিডিয়া স্বাধীনতা দীর্ঘদিন ধরে চ্যালেঞ্জের মুখে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৪) ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসুজ্জামান শামসকে জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে একটি প্রতিবেদনের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল।

জুলাই আন্দোলনের পর সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করা হলেও, নতুন হুমকি এবং ভাঙচুরের ঘটনা সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৬৫তম স্থানে রেখেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। আরআরএজির পরিচালক সুহাস চাকমা বলেছেন, “আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পরে সাংবাদিকরাই ইউনুসের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।”

অভিযোগ রয়েছে যে, ইউনুস সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি “যৌথ প্রযোজনা” চলছে, যেখানে সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেফতারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সমর্থন করছে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম বর্তমানে একটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সাংবাদিকরা আন্দোলনকারীদের হুমকি, সরকারি নিপীড়ন এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের বিতর্কিত ডকুমেন্টারি এবং সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনা মিডিয়া স্বাধীনতার উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে বাংলাদেশে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

Visited 222 times, 1 visit(s) today