ফেসবুক পোস্টে পুলিশ হত্যার স্বীকারোক্তির পরেও নীরব প্রশাসন

ফেসবুক পোস্টে পুলিশ হত্যার স্বীকারোক্তির পরেও নীরব প্রশাসন
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ৪ঠা মে, ২০২৫

রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা নাফিজ মোহাম্মদ আলম নামের এক যুবদল নেতা তার ফেসবুকে পোস্টে জুলাই-আগস্টের জঙ্গি হামলার সময় পুলিশের ওপর গুলি চালানোর স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে স্বীকারোক্তির পরেও তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী জুলাই-আগস্টে হাজারো পুলিশ হত্যার উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি আমলে নিলেও এমন আত্মস্বীকৃত খুনিকে আইনের আওতায় নেওয়া উচিৎ বলে মনে করেন শহিদ পুলিশ সদস্যের পরিবারবর্গের।

গত ১লা মে নিজের ফেসবুক একাউন্ট থেকে যুবদল নেতা নাফিজ এই গুলি চালানোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেন। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরা এলাকায় থানায় হামলা চালানোর সময় পুলিশ যখন আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা গ্রহণ করছিল, সেসময় তিনি পুলিশদের পিছু হঠাতে তাদের ওপর পাল্টা গুলি চালান।

নাফিজ পোস্টে লিখেছেন: “পুলিশ থামানোর কোনো উপায় না দেখে, নবাব হাবিবুল্লাহ কলেজের ছাদ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি নিয়ে থানার ছাদের উপর অবস্থানরত পুলিশদের দিকে পাল্টা আঘাত করি। আমার দেওয়া কাভার ফায়ারের সুযোগে সাধারণ জনগণ থানা ঘেরাও করে।”

এছাড়া, ওই পোস্টে নাফিজ একটি ছবি সংযুক্ত করেন, যেখানে তাকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায়। ছবির ক্যাপশনে তিনি উল্লেখ করেন, “ছবিটি তোলার সময় এক ছোটভাই বলেছিল, অস্ত্র সাইডে রেখে ভিক্টরি চিহ্ন দেখাতে। সেই মুহূর্তটিই স্মৃতির পাতায় বন্দী করেছিলাম।”

অনুসন্ধানী জানা যায়, নাফিজ মোহাম্মদ আলম দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি যুবদলের পদধারী নেতা। তিনি বিএনপির সংগঠক হিসেবে পরিচয় দেন এখন।

স্থানীয়রা জানান, নাফিজ নারী ও মদের ব্যবসার সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। ফেসবুকে এ সম্পর্কিত বিজ্ঞাপনও প্রকাশ করেন। বিগত সরকারের সময়ে র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া সত্ত্বেও তিনি আবারো এই ব্যবসায় সক্রিয় হয়েছেন।

বিএনপি নেতা ও মেয়র ইশরাকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবদল নেতা নাফিজকে গত বছরের ৮ই অক্টোবর খিলক্ষেতের লেকসিটির কনকর্ড ছায়ানীড় নামক বহুতল ভবনের একটি বিলাসবহুল স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট থেকে গুলিসহ দুটি বিদেশি পিস্তল, ওয়াকিটকি ও বিপুল মদ ও তিন সঙ্গীসহ গ্রেপ্তার করে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। যদিও ক্ষমতার ব্যবহারে কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি বেরিয়ে এসেছেন।
যদিও কালের কণ্ঠসহ একাধিক পত্রিকা বিএনপির ভাবমূর্তি রক্ষায় নাফিজকে ছাত্রলীগ নেতা দাবি করে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করেছিল। তবে রিউমার স্ক্যানার এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনে নাফিজের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে। নাফিজ বিএনপির রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও তাকে বিএনপির প্রচার প্রচারণার কাজ করতে দেখা গেছে।
এর আগে সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক তাসনীম খলিল ও ইউটিউবার জুলকারনাইন সায়ের সামির সহযোগিতায় এই নাফিজ ডয়চে ভেলেকে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় র‌্যাব তাকে মিথ্যা মামলায় নির্যাতন করেছে।
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে র‌্যাবের যে কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছিলেন নাফিজ, তার হাতেই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বিপুল পরিমাণ মদের অবৈধ চালানসহ। নাফিজের বাড়িতে সেসময় র‌্যাবের ব্যাজ, হ্যান্ডকাফ, কয়েকটি বিদেশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ব্যাটন, ওয়াকিটকিসহ র‌্যাবের স্টিকার লাগানো গাড়ি পাওয়া যায়।
নাফিজের কাছ থেকে নারীদের ব্ল্যাকমেল করার মত বিপুল পরিমাণ কন্টেন্ট পাওয়া যায়। বিত্তশালী পরিবারের নারীদের সাথে প্রতারণা করে তাদের সাথে যৌনকর্মের ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণ করতেন, সেসব ব্যবহার করে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নিতেন তিনি। এটা তার অন্যতম ব্যবসা ছিল। এ সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য-প্রমাণ বিডি ডাইজেস্ট-এর হাতে রয়েছে।

গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে নাফিজ অস্ত্র প্রদর্শন করে উত্তরা এলাকায় শোডাউন করছেন এখনও। তার এই স্বীকারোক্তিমূলক ফেসবুক পোস্ট ও প্রকাশ্য অস্ত্র প্রদর্শনের পরেও প্রশাসনের কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই জানতে চাচ্ছেন, কেন এমন গুরুতর অপরাধে প্রশাসন নীরব? তার ক্ষমতার উৎস কোথায়?

জনমনে আশঙ্কা, পুলিশের ওপর গুলি চালানোর স্বীকারোক্তি দেওয়া এই ব্যক্তি কি শুধুমাত্র ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিচার থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন? তাছাড়া পুলিশ হত্যাকারী এই ব্যক্তি জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের গতিপ্রবাহ ভিন্নখাতে নিতে যে সাধারণ মানুষকেও হত্যা করেনি, সে নিশ্চয়তাই বা কে দিবে?

Visited 8,422 times, 1 visit(s) today