নিজস্ব প্রতিবেদক | ৪ঠা মে, ২০২৫
সরকারি সেবা গ্রহণে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নাগরিকদের বর্তমানের তুলনায় বেশি খরচ বহন করতে হতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন ধরনের ফি, সুদ, মুনাফা, স্ট্যাম্প বিক্রি, টোল, ইজারা এবং ভাড়ার হার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও শুল্ক হলেও, কর ছাড়া প্রাপ্তি (নন-ট্যাক্স রেভিনিউ-এনটিআর) খাত থেকেও সরকার গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণে আয় করে থাকে। চলতি অর্থবছরে এই খাত থেকে ৪৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আগামী অর্থবছরের জন্য তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, সেবা মাশুল তিন বছর পরপর অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী হালনাগাদ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সেবার খরচ, জীবনযাত্রার মান, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যদিও বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি মাশুল বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হবে না, কিন্তু বাস্তবে তৃণমূল থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত হাটবাজারের ইজারা, মোবাইল কোর্টের জরিমানা, সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ের টোল এবং প্রশাসনিক সেবার ফি কিছুটা বাড়ানো হতে পারে।
রাজস্ব আদায়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহের হার ৮ শতাংশের নিচে।
২০২২ সালে ডলার-সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের জন্য আবেদন করে এবং ২০২৩ সালে তা অনুমোদিত হয়। সেই ঋণের শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত প্রতি বছর ০.৫ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এই চাপের অংশ হিসেবেই এনটিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ এনটিআর থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায়ে অসন্তুষ্ট। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে তেমন আগ্রহ নেই। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ফি বৃদ্ধির উদ্যোগেও আপত্তি তোলে। যেমন, কাঁচা পাট রপ্তানিতে ৩০ বছর আগে নির্ধারিত মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাব দিলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। অথচ বাজেট তৈরির অংশ হিসেবে কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন টোল ও মাশুল বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এনটিআর খাতে বড় ১০টি আয়ের উৎসের মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ ও মুনাফা। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে ৭ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় কম। সরকারি কর্মচারী, আর্থিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণের বিপরীতে প্রাপ্ত সুদ থেকেও রাজস্ব আসে, যার লক্ষ্য আগামী অর্থবছরে আরও বাড়ানো হচ্ছে।
আইন লঙ্ঘনের কারণে আরোপিত জরিমানা ও বাজেয়াপ্তকরণ থেকেও আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যা ৬৪৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সেবামূলক কার্যক্রম থেকেও আয় আসে। যেমন, আমদানি-রপ্তানি সনদ, কোম্পানি নিবন্ধন, বিমা প্রিমিয়াম, সমবায় সমিতির নিরীক্ষা, নিবন্ধন ও নবায়ন মাশুল ইত্যাদি থেকে সরকার ১০ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। পাশাপাশি হাট-ঘাট ইজারা ও ভাড়া, টোল ও লেভি এবং পুরোনো গাড়ি বা আসবাব নিলামের মতো খাত থেকেও যথেষ্ট রাজস্ব সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, এনটিআর থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য সুসংগঠিত পরিকল্পনা থাকা দরকার। শুধু এনবিআরের মাধ্যমে আয় বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বরং এনবিআরের বাইরেও যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ের সুযোগ আছে, তা কাজে লাগানো উচিত।
তিনি আরও বলেন, সামান্য মাশুল বৃদ্ধিতে অনেকে সমালোচনা করলেও অর্থনীতি বড় হলে সরকারের ব্যয়ও বাড়ে, এবং সংগৃহীত অর্থ জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হয়।
