একাত্তরের ১৭ই এপ্রিল: বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অভ্যুদয়

একাত্তরের ১৭ই এপ্রিল: বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অভ্যুদয়
শেয়ার করুন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস হলো সম্মিলিত সাহস, অপরাজেয় মনোবল এবং ন্যায়ের জন্য অটুট সংগ্রামের এক মহাকাব্য। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন এক স্বপ্নদ্রষ্টা নেতা – জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর দিবস এই সংগ্রামের এক যুগান্তকারী মোড়, যেদিন ১৯৭১ সালে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার, যা স্বাধীনতা অর্জনের পথকে সুদৃঢ় করেছিল।

বাংলাদেশের জন্মকথা বলতে গেলে সবার আগে আসে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম – স্নেহের ডাকনামে যিনি বঙ্গবন্ধু। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার, শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম এবং জনগণের সাথে তাঁর গভীর বন্ধনই স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করেছিল। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল এক যুদ্ধসজ্ঞার ডাক: “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!”

স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট – পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আর বঞ্চনা মেনে নেবে না।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী চালায় অপারেশন সার্চলাইট – ঢাকাসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে শুরু হয় নৃশংস গণহত্যা। স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে স্তব্ধ করাই ছিল এর লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মুক্তির আগুন তখনই প্রজ্বলিত হয়ে গিয়েছিল।

১০ই এপ্রিল ১৯৭১, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী অথচ ক্ষমতায় বসতে না দেয়া আওয়ামী লীগের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে জারি করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, তাঁকে করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি – কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থাতেই।

এর এক সপ্তাহ পর, ১৭ই এপ্রিল, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার (পরবর্তীতে নামকরণ করা হয় মুজিবনগর) এক আমবাগানে ইতিহাস সৃষ্টি হয়। খোলা আকাশের নিচে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শপথ নেয় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে। এটি ছিল কেবল একটি অনুষ্ঠান নয় – এদিনই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকল্প রূপ নেয় একটি বৈধ সরকারে। মুজিবনগর থেকে নির্বাসিত এই নেতৃত্ব যুদ্ধ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

মুজিবনগর ছিল কেবল একটি অস্থায়ী রাজধানী নয় – এটি ছিল বাংলাদেশের প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। এক নৃশংস শত্রু, শরণার্থী সংকট ও সীমিত সম্পদের বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে বাংলার মানুষ লড়েছিল অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায়। প্রতিটি গ্রাম হয়ে উঠেছিল যুদ্ধক্ষেত্র, প্রতিটি নাগরিক হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধা – বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে।

২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১েই ডিসেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে পালিত হলেও ১৭ই এপ্রিল হলো এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ – যেদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা এক দিনের অর্জন নয়, বরং তা এসেছিল কৌশল, ত্যাগ ও অটুট সংকল্পের মধ্য দিয়ে।

আজ মুজিবনগর দিবসে আমরা সেই মূল্যবোধগুলোকেও স্মরণ করি যা এই জাতির জন্ম দিয়েছিল: গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও ঐক্য। বঙ্গবন্ধুর লেখা – বিশেষ করে তাঁর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” – কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, বরং তা একটি জাতি গঠনের রাজনৈতিক রোডম্যাপ।

১৯৭১ থেকে সময় যত দূরে সরে যাচ্ছে, ততই এই ইতিহাস স্মরণ করা, শেখানো ও লালন করার দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মুজিবনগর দিবস কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয় – এটি আমাদের আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের জন্য সংগ্রামের এক জীবন্ত স্মারক।

বাংলাদেশের জন্ম ছিল কেবল সীমানা পুনর্নির্ধারণের ঘটনা নয় – এটি ছিল একটি জাতির ইচ্ছার বিজয়। আর মুজিবনগর ছিল সেই ইচ্ছার প্রথম আনুষ্ঠানিক রূপ। আজ এই দিনে আমরা কেবল স্মরণ করেই ক্ষান্ত হব না – বরং বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাব: সমতা, গণতন্ত্র ও অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের পথে। কারণ আমাদের অতীতকে স্মরণ করাই হলো ভবিষ্যতের প্রতি সেই শ্রদ্ধা নিবেদন – যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন: একটি স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

জয় বাংলা।

Visited 22 times, 1 visit(s) today