সংবাদ প্রতিবেদন
হা-মীম গ্রুপের ‘দ্যাটস ইট স্পোর্টসওয়্যার’ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহসান উল্লাহকে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণ মিলেছে। গাড়ির ভেতরে উচ্চশব্দে গান বাজাতে বাজাতে প্রথমে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। হাত-পা বেঁধে তাকে মাইক্রোবাসের পেছনে শুইয়ে রাখা হয়। পা দিয়ে বুক ও শরীরের নানা অংশে লাথির পর লাথি মারা হয়। গলায় গামছা পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে খুনিরা। এরপর গাড়ি থেকে নামিয়ে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। নিহতের পিঠ ছিল ক্ষতবিক্ষত। গাড়ির ভেতরের নির্যাতনের শব্দ যেন বাইরে না যায়, সেজন্য ৪ ঘণ্টা ধরে উচ্চশব্দে গান ছেড়ে রাখা হয়।
আদালতে আসামির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
২৩শে মার্চ খুন হন হা-মীমের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার আহসান। আশুলিয়ার কর্মস্থল থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে ঢাকার বাসায় ফিরছিলেন তিনি সেদিন।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তাদের মধ্যে আহসানের গাড়িচালক সাইফুল ও তার বন্ধু নুরুন্নবী রয়েছেন। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া ইস্রাফিল ও সুজন নামে আরও দুজনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তুরাগ থানা পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের জবানবন্দি ও জিজ্ঞাসাবাদে পুরো পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও টার্গেট করার কারণ জানতে পেরেছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে চালক সাইফুল জানান ১২ই মার্চ হত্যার ছক কষা হয়। বাস্তবায়নে জন্য পূর্ব পরিচিতি নুরুন্নবীকে ভাড়া করেন তিনি। নুরুন্নবী ও সাইফুল একসঙ্গে গার্মেন্টেসে চাকরি করতেন। মিশনে ইস্রাফিল ও সুজনকে শামিল করেন নুরুন্নবী।
ঘটনার দু’দিন আগে তুরাগ এলাকা রেকি করেন তারা। আহসানকে নিয়ে অফিস থেকে ফেরার পথে প্রস্রাব করার নামে কোথায় গাড়ি থামাবেন তা আগেই ঠিক করা ছিল। সাইফুল অন্যদের টোপ দেন, গাড়িতে আহসানকে জিম্মি করা গেলে অনেক টাকা আদায় করা সম্ভব।
ছক মোতাবেক তুরাগে পূর্ব নির্ধারিত স্পটে বিকেল ৪টার দিকে প্রস্রাব করার নামে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন সাইফুল। এসময় তার তিন সহযোগী গাড়িতে উঠে পড়েন। দুজন গাড়ির পেছনে আহসানের পাশে, অন্যজন চালকের বাম পাশের আসনে বসে যান। সাইফুল ফের গাড়িতে ফিরে নাটক শুরু করেন। আগন্তুকদের না চেনার ভান করে বলে উঠেন- ‘আপনারা কারা আমার গাড়িতে উঠেছেন?’ তারা কোনো উত্তর না দিয়ে আহসানের হাত-পা বেঁধে ফেলে। চোখ খোলা ছিল। বাজানো হয় উচ্চশব্দে গান।
চারজনের কথোপকথন ও কর্মকাণ্ডে আহসান বুঝে ফেলেন সবাই একে অপরের পরিচিত। খুনিরাও সেটা টের পেয়ে যান। প্রাণে বাঁচতে আহসান তাদের ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার কথা জানান। তবে তারা সাড়া দেননি।
গাড়ি বেড়িবাঁধ, গাবতলী, দিয়াবাড়ি রেলস্টেশন, ১৬ নম্বর সেক্টরে ঘুরতে থাকে। খুনের আগে গাবতলী এলাকায় আহসানকে ইফতার করান তারা। এরইমধ্যে তার ব্যাংকের কার্ড থেকে দুটি মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে ৫০ হাজার টাকা ট্রান্সফার করা হয়। এরমধ্যে একটি নম্বর সাইফুলের স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত, আরেকটি তার বোনের। আরও ১০ হাজার টাকা কার্ড থেকে তুলে নেন তারা। এছাড়া নগদ ২৫ হাজার টাকা লুট করে। সব মিলিয়ে ৮৫ হাজার হাতিয়ে নেওয়া হয়।
এরমধ্যে নুরুন্নবীকে মাত্র ১ হাজার ও ইস্রাফিলকে ২ হাজার টাকা দেওয়া হয়। সুজন কোনো টাকা পাননি। ভাগের টাকা সবাইকে পরে দেওয়া হবে জানান সাইফুল। নির্যাতনের এক পর্যায়ে আহসানকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেন নুরুন্নবী। তখন সাইফুল বলেন- হত্যা না করলে সবাই ধরা পড়ে যাবে। পরে অন্যরা তাদের হত্যা মিশনে সহযোগিতা করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আহসানকে হত্যার নেপথ্যে দুটি কারণ জানান চালক সাইফুল। প্রথমত, গত আগস্টে সামান্য দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসের কিছু ক্ষতি হয়। তখন সাইফুল নিজ উদ্যোগে ইন্সুরেন্স থেকে মেরামতের টাকা আদায়ে সহায়তা করেন। তার ধারণা ছিল, ওই টাকা থেকে একটি ভাগ আহসান তাকে দেবেন। সেটা না পেয়ে ক্ষোভ ছিল তার। তাছাড়া, মাসে ১৯ হাজার টাকা বেতনের বাইরে কোনো সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে মনক্ষুন্ন ছিলেন তিনি। এ ক্ষোভ থেকে মালিককে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের ফন্দি করে।
র্যাব-১ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মুহাম্মদ আহনাফ রাসিক বিন হালিম বলেন, অফিস থেকে বাসায় না ফেরায় তুরাগ থানায় জিডি করেছিল পরিবার। এরপর শুরু হয় তদন্ত। একে একে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে। তুচ্ছ কারণে নৃশংসভাবে প্রকৌশলীকে আহসান উল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২৫শে মার্চ দিয়াবাড়ির ১৬ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের রাস্তার পাশ থেকে আহসানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর র্যাব ছায়াতদন্ত করে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে গাইবান্ধা থেকে মূল পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। ২৬শে মার্চ লালমনিরহাট থেকে নূরন্নবী ও গাজীপুরের কাশিমপুর থেকে ইস্রাফিলকে গ্রেপ্তার করে র্যব। সবশেষে ধরা হয় সুজনকে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফরহাদুজ্জামান নবীন বলেন, ছুরি, স্টাম্প, ব্যাংকের চেক, ভিক্টিমের মোবাইল ফোনসহ বেশকিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। ভয় দেখানোর জন্য ছুরিটি রাখা হয়েছিল, তবে ব্যবহার করা হয়নি। হত্যা করা হয়েছিল গামছা ব্যবহার করে।
