নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ২৫ মার্চ ২০২৫: গত ২২ মার্চ আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে একটি প্রতিবাদী সমাবেশের আয়োজন করে। এই সমাবেশে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ। তিনি সেনানিবাস উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে “কুকুরের বাচ্চা” বলে সম্বোধন করেন। এই সমাবেশে এবি পার্টির নেতা ও সদস্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, যা আইনি ও বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
উক্ত অনুষ্ঠানের ভিডিওঃ
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পর গত ৫ সেপ্টেম্বর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে আইন মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে তাজুল ইসলামকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ট্রাইব্যুনালটি পুনর্গঠন করা হয়। তবে, এই পদে যোগদানের আগে তাজুল ইসলাম এবি পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি গত ৭ সেপ্টেম্বর দল থেকে পদত্যাগ করেন, যা এবি পার্টির প্রচার সম্পাদক আনোয়ার সাদাত টুটুল নিশ্চিত করেছেন। টুটুল বলেন, “চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগপত্র আমাদের কাছে জমা আছে।”
কিন্তু পদত্যাগের পরও তাজুল ইসলামের এবি পার্টির একটি সমাবেশে উপস্থিতি এবং এমন একটি মঞ্চে অংশগ্রহণ, যেখানে সেনানিবাস উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং রাষ্ট্রপতির প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে, তা নিয়ে আইনজীবী ও বিচার বিভাগের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির এমন একটি রাজনৈতিক সমাবেশে উপস্থিতি কীভাবে নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের এক আইনজীবি বলেন,
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকবে। চিফ প্রসিকিউটর বিচারক না হলেও তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে বলাই আছে, প্রসিকিউটরগণ মামলা পরিচালনায় নিরপেক্ষ থাকবেন এবং কেবলমাত্র আইনি বিষয়াদির ভিত্তিতে কাজ করবেন। একজন চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব হল, ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর বিচার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করা।
সেক্ষেত্রে, একজন চীফ প্রসিকিউটরের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা রাজনৈতিক সমাবেশে উপস্থিতি আইনের শাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে।
তিনি আরো যোগ করেন
আবার, Cannons of Professional Conduct and Etiquette মোতাবেক, একজন আইনজীবী বিচার ব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং তিনি এমন কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে পারবেন না, যা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। সুতরাং একজন চীফ প্রসিকিউটরের রাজনৈতিক সমাবেশে উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি সরাসরি conflict of interest তৈরী করে।
সর্বোপরি, একজন চীফ প্রসিকিউটর হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সংযুক্তি আইনের শাসনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে। অবশ্য এজন্য সরকার বা ট্রাইব্যুনাল যদি চান, চীফ প্রসিকিউটরের নিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারে। আবার কেউ যদি তার পদে থাকার বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে চান, তবে বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক রিট পিটিশন দায়েরেরও সুযোগ রয়েছে। আবার বাংলাদেশ বার কাউন্সিল যদি চান, তবে তার আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে পারেন।
এই ঘটনা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকে মনে করছেন, তাজুল ইসলামের এই পদক্ষেপ আইনি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। এ বিষয়ে সরকারি বা ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে, এই ঘটনা আগামী দিনে আইনি ও রাজনৈতিক মহলে বড় আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
