গোমাংস না রাখায় উগ্রবাদীদের হামলায় বন্ধ হলো নিরামিষাশী হিন্দু হোটেল

গোমাংস না রাখায় উগ্রবাদীদের হামলায় বন্ধ হলো নিরামিষাশী হিন্দু হোটেল
শেয়ার করুন
সংবাদ প্রতিবেদন

গোমাংস রান্না হয় না, এমন অজুহাতে হিন্দুদের একটি নিরামিষ হোটেল বন্ধ করে দিল উগ্রবাদীরা।

গতকাল ১৬ই জানুয়ারি রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় অবস্থিত গোবিন্দা’স কিচেন নামের একটি নিরামিষাশী হিন্দু হোটেলে ভাঙচুর করা হয়। এরপর থেকেই হোটেলটি বন্ধ রয়েছে।

গতকালের সেই হামলায় উগ্রবাদী লোকজন নিজেদের ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয় দিয়ে ওই হোটেলে হামলা চালায়। তাদের হামলা ও ভাঙচুরে বাধা দিতে গিয়ে আহত হন কয়েকজন কর্মচারী। এসময় উগ্রবাদীরা হোটেলের ম্যানেজার ও মালিকপক্ষকে শাসিয়ে যান।

গোমাংসের অজুহাত দিলেও মূলত এই হোটেলকে হামলা করা হয়েছে বিপুল ফ্যান-ফলোয়ার সমৃদ্ধ ‘প্যারাডক্সিকাল সাজিদ’ নামের উগ্রবাদী একটি ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো উস্কানিমূলক পোস্টের কারণে।

অভিযোগ, হিন্দু হোটেলগুলো থেকে বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, হিন্দুত্ববাদীরা এসব হোটেলে আস্তানা গেঁড়েছে, এসব হোটেল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার শাখা হিসেবে কাজ করছে, এমন নানা ধরনের উস্কানিমূলক বার্তা ছড়িয়ে গোবিন্দা’স হোটেলে হামলা চালানোর ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে।

শুধু ঢাকার মালিবাগের এই হোটেলটিই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের কয়েকটি হিন্দু হোটেলকেও এভাবে হিন্দুত্ববাদীদের আস্তানা আখ্যা দিয়ে সেসবের ওপর নজরদারি করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

গোবিন্দা’স কিচেনে হামলার ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষও ক্ষোভ জানিয়েছেন।

জানা গেছে, ঢাকার মালিবাগ এলাকার ‘গোবিন্দা’স কিচেন’ মূলত একটা নিরামিষাশী হোটেল। এখানে অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে সব্জি দিয়ে সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবার বিক্রি হতো। যার ফলে স্থানীয় হিন্দুরা ছাড়াও স্বল্প আয়ের অনেক মুসলিম ভোক্তাও এখানে নিয়মিত আহার করেন।

হামলার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবাদ জানান অনেকেই।

রজত সাহা নামের স্থানীয় এক হিন্দু বলেন, ‘আমরা স্বাত্তিক আহার করি। আমরা ছাড়াও আরও অনেকেই সামর্থের করণে মাছ, মাংস খান না। এই নিরামিষাশী হোটেলগুলো আমাদের ছিল আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। এখানে শুধু হিন্দুরা নয়, স্থানীয় মুসলিমরাও আসেন। অনেক নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ অল্প খরচে পেটপুরে খেতে পারত। এখন তারা কোথায় যাবে?’

শুধু গোবিন্দা’স হোটেলই নয়, গোমাংস না রাখায় ‘রাজধানী হোটেল এণ্ড রেস্টুরেন্ট’ নামের ঢাকার একটি মুসলিম মালিকানাধীন হোটেলকেও হিন্দুত্ববাদীদের দোসর আখ্যা দিয়ে ভাঙচুর চালায় উগ্রবাদীরা। ভারতের দালাল, ইসকনের আখড়া, হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে কাজ করছে, এমন নানা তকমা দিয়ে ম্যানেজার ও কর্মচারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। দাঁড়ি-টুপি শোভিত একজন বয়স্ক ব্যক্তি হোটেলটির ম্যানেজার, সাইনবোর্ডে লেখা ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’, তবুও সেই হোটেলের মালিকপক্ষকে ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে চালানো হলো চরম আগ্রাসন।

দুটি হোটেলে ভাঙচুর ও তাণ্ডবের পর পুলিশের উপস্থিতি ছিল না। এমনকি প্রশাসনেরও কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়, অদ্ভূত নীরবতা দেখা গেছে দেশের প্রথম সারির শীর্ষ সংবাদমাধ্যম এমনকি টিভি চ্যানেলগুলোতেও। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনরাও।

কাজল চন্দ্র দাস নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এ দেশটা চলছে মগের মুল্লুকের মতন। দেশে এখন কোন আইন নেই, বিচার নেই। আছে শুধু গা জোয়ারি। সংখ্যালঘুদের কথা শোনার মতন কেউ নেই, বুদ্ধিজীবীরাও নেই। একাত্তরে আমরা পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতা। চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমরাও সামিল ছিলাম এই কারণে যে, আমরা নতুনভাবে বাঁচতে পারব। কিন্তু আমরাও বৈষম্যর শিকার।

তিনি আরও লিখেছেন, আগেও বৈষম্যের শিকার ছিলাম, এখন তারচেয়েও বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছি মৌলবাদী, উগ্রপন্থীদের জন্য। যারা বিভিন্ন মঞ্চে উঠে বলেন- সবার পাশে আছি, কিন্তু মঞ্চের বাইরে গিয়ে তারা অন্য কথা বলে। গোপনে সংখ্যালঘুদের দেশ থেকে তাড়ানোর পরিকল্পনা করে। আচ্ছা সংখ্যালঘুরা যে দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য এই ইউনূস সরকারের কাছে চাইছে, এগুলো কি অবাস্তব? তাহলে কেন আমরা বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকব? এর জবাব কি ইউনূস সরকার দেবে?’

Visited 1,892 times, 1 visit(s) today