অর্থনীতি
দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যাংক খাতের অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে। ৫ই আগস্টের পর গত তিন মাসে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে। গ্রাহকেরা আমানত তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়ায় অনেক ব্যাংক নগদ অর্থ দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সাভার শাখায় টাকা তুলতে না পেরে গ্রাহকেরা ব্যাংকের ভেতরে বিক্ষোভ করেছেন এবং কর্মকর্তাদের আটকে রেখে শাখায় তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, বেশ কিছু ব্যাংকে গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা, এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
ন্যাশনাল ব্যাংক, আইসিবি, পদ্মা, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকেরা জমানো টাকা তুলতে পারছেন না। অনেক ব্যাংক দুই হাজার টাকা পর্যন্তও নগদ দিতে পারছে না। কোনো কোনো ব্যাংকে তদবিরের মাধ্যমে মাত্র ৫ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে।
গ্রাহকেরা তাদের জমানো অর্থ না পেয়ে চিকিৎসা, সন্তানের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। একাধিক গ্রাহক জানিয়েছেন, দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে অর্থ পাচ্ছেন না।
৫ই আগস্টের পর গ্রাহকেরা ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট রয়েছে। তবে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ব্যাংকে দুই লাখ টাকার নিচে থাকা আমানত বীমার আওতায় রয়েছে।
কিন্তু গ্রাহকেরা অভিযোগ করছেন যে, এমনকি ছোট অঙ্কের অর্থ তুলতেও ব্যাংকে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম আলী বলেন, ব্যাংকে টাকা থাকা সত্ত্বেও চেক ফেরত দেয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।
মাত্র দুই-একটি সবল ব্যাংকের আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা কিছুটা ফিরে এসেছে। তবে বাকি প্রায় সব ব্যাংকের চিত্র একই। সর্বত্র গ্রাহক অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। বারবার চেক ফেরত দেওয়া হচ্ছে, টাকার অংক শুধরে দুবার-তিনবার পর্যন্ত যেতে হচ্ছে ব্যাংকে। যার ফলে ব্যবসা বা জরুরি প্রয়োজনে টাকা তোলা ঝক্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ বলেন, আমরা চেষ্টা করছি গ্রাহকদের ভোগান্তি কমানোর। আশা করি সামনে সমস্যা কেটে যাবে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ওয়াসেক মোহাম্মদ আলী বলেন, কীভাবে গ্রাহকদের সামলাবো বুঝতে পারছি না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় সমস্যার সমাধান হবে।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নগদ অর্থ ধার করার সুযোগ করে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমানত বীমার আওতায় প্রতিটি অ্যাকাউন্টে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিরাপদ বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা জানিয়েছেন, ইসলামী ধারার ব্যাংকে সংকট থাকলেও সার্বিকভাবে তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর্পোরেট অনিয়মের ফলে তৈরি হওয়া এই সংকট ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা দুর্বল করে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সবল ব্যাংকগুলোর প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির পথে। গ্রাহকদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, তাদের জমা অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং সংকট শিগগিরই সমাধান হবে।
