রপ্তানি আয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির হিসাবে গড়বড়

রপ্তানি আয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির হিসাবে গড়বড়
শেয়ার করুন
অর্থনীতি ডেস্ক:

দেশের রপ্তানি আয়ের হিসাব নিয়ে উদ্ভূত গরমিল এবং সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানের অসঙ্গতি নিয়ে সমালোচনা বেড়েই চলছে। সম্প্রতি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য ধরা পড়ায় রপ্তানিখাতের ওপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়িক মহল থেকে নীতি-নির্ধারক মহল, সকল স্তরে এ নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের দাবি, দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যান সঠিক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে ইপিবি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এখন বেশ প্রকট রূপ নিয়েছে।

গত ৯ই অক্টোবর ইপিবি এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৩ মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পণ্য রপ্তানি আয়ে বাংলাদেশ ১ হাজার ১৩৭ কোটি ডলার আয় করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বৃহস্পতিবার (৭ই নভেম্বর) প্রকাশিত তাদের ‘উইকলি সিলেক্টেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সময়ের রপ্তানি আয়ের হিসাব দিয়েছে ১ হাজার ৫৬ কোটি ডলার। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির তথ্যে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ডলার, যা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে গণ্য হয়।

এর আগে ইপিবির পক্ষ থেকে রপ্তানি আয়ের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল তাতেও গরমিল পাওয়া গিয়েছিল। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরেই ইপিবির তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে পারছিলেন না। তাদের দাবি ছিল, ইপিবির দেওয়া তথ্য বাস্তবসম্মত নয় এবং এর মাধ্যমে সঠিক পরিসংখ্যানের বিকৃতি ঘটছে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন এই অসঙ্গতির কারণ হিসেবে বলেন, “জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে রপ্তানির তথ্য সংগ্রহ করে ইপিবি। তবে কিছু ক্ষেত্রে একই রপ্তানির তথ্য একাধিকবার হিসাব করা হয়েছিল। সেই কারণে এমন গরমিল হয়েছে।”

এরপর থেকেই ইপিবি জানায়, তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সঠিক তথ্য প্রদানের লক্ষ্যে সংশোধনী আনছে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যানের দাবি অনুযায়ী, তারা সংশোধিত তথ্য প্রকাশ করবে এবং নিয়মিতভাবে মাসিক রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যান প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া সাপ্তাহিক রপ্তানি তথ্য প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের খাতগুলোর অন্যতম নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিটিএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক এখন যে তথ্য প্রকাশ করছে সেটাই প্রকৃত এবং যৌক্তিক তথ্য। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়টি বলছিলাম।”

তার মতে, “সঠিক তথ্য না দেওয়ার কারণে এতদিন নীতিনির্ধারকদের কাছে ভুল বার্তা গেছে। এর ফলে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে যাতে কোনো পার্থক্য না থাকে সেটাই আমাদের দাবি।”

এমন অবস্থা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়হীনতার আরও এক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের অসঙ্গতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে বৈদেশিক বিনিয়োগেও প্রভাব পড়তে পারে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের রপ্তানি আয়ের হিসাব নিয়ে এমন অসঙ্গতি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, রপ্তানি আয়ের ভিন্নতা চলতি হিসাব ও আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের তথ্য নতুনভাবে প্রকাশ করেছিল, যার ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে পণ্য রপ্তানি আয় প্রায় ১ হাজার ৮১ কোটি ডলার কম ছিল। এ পরিস্থিতি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতির সৃষ্টি করে যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রথমবারের মতো ইপিবি চার মাসের রপ্তানি আয়ের তথ্য একত্রে প্রকাশ করলেও অক্টোবর মাসের রপ্তানি আয়ের তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি। নভেম্বরের ৭ তারিখ পার হলেও ইপিবি অক্টোবর মাসের রপ্তানি আয়ের কোনোরূপ তথ্য দেয়নি, যা আবারও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে এমন একটি সময় এসেছে যখন রপ্তানি আয়ের সঠিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। রপ্তানি আয়ের তথ্যটি সঠিকভাবে প্রকাশিত হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হুমায়ুন রশীদ বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে রপ্তানি আয়ের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক তথ্য না থাকায় নীতি-নির্ধারণে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং ব্যবসায়ী সমাজের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে। একাধিক আর্থিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে রপ্তানির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে সঠিক তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং রপ্তানিকারক, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে বলে অভিমত এই অর্থনীতিবিদের।

তার মতে, ইপিবি, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের গরমিল বা অসঙ্গতি এড়ানো যায়। সঠিক ও নির্ভুল তথ্যই অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল ভিত্তি, আর এই ভিত্তির মজবুত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।

Visited 117 times, 1 visit(s) today