জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতদের সংখ্যা বেড়েই চলছে, কমছে নিহত-আহত পুলিশের সংখ্যা

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতদের সংখ্যা বেড়েই চলছে, কমছে নিহত-আহত পুলিশের সংখ্যা
শেয়ার করুন

জুলাই আগস্ট আন্দোলনে বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েই চলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত পুলিশের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যা ও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের বরাত দিয়ে নিহত পুলিশের সংখ্যা ৪৪ জন বলে উল্লেখ করা হয়। নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্যের বিস্তারিত পরিচয়সহ (নাম, পদবি, কোন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন, ঘটনাস্থল ও মৃত্যুর দিনক্ষণ উল্লেখ) তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় ৪ই আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানাতেই পুলিশ হত্যা করা হয় ১৩ জন, যার মধ্যে একজন ছিলেন সন্তান সম্ভবা নারী পুলিশ সদস্য। ৫ই আগস্ট যাত্রাবাড়ি পুলিশ ফাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে হত্যা করা হয় ৩৩ জনকে, সেই ভিডিও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে। এই দুই থানাতেই ৪৬ জন পুলিশ হত্যার টাটকা প্রমান রয়েছে। ৪ই আগস্ট খুলনায় পুলিশ ফাড়িতে ঢুকে পিটিয়ে মারা ৬ পুলিশ সদস্যের লাশ ডোবা থেকে উদ্ধার করে হয়েছিল। এছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশুলিয়া, সাভার, চিটাগাং রোড জুড়ে আরো সহস্রাধিক পুলিশ হত্যার খন্ড খন্ড ভিডিও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংকলিত কিছু পুলিশ হত্যার ভিডিও।

https://www.facebook.com/share/v/e5kccgXZRx8Hv2bu/

কোথাও রাস্তায় ফুটওভার ব্রীজের উপর থেকে পুলিশকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে, কোথাও পুলিশের পোড়া গাড়িতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে কয়লা হয়ে যাওয়া পুলিশের মৃতদেহ, কোথাও ডিশের, টেলিফোনের তার দিয়ে প্যাঁচানো পুলিশের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ। এমনও দেখা গেছে পুলিশের মৃতদেহের আন্ডারওয়ার খুলে লাঠি দিয়ে গোপনাঙ্গ পরীক্ষা করা হচ্ছে যে সেটা কি মুসলমান পুলিশের লাশ নাকি হিন্দু লাশ। এমন কর্মকান্ডের পিছনে যেই মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে সেটা ছিল আন্দোলনের সময়ে ছড়িয়ে পড়া গুজব যে, বাংলাদেশ পুলিশের পোষাকে হাজার হাজার ভারতীয় র’এর এজেন্ট রয়েছে।

৫ই আগস্ট সরকার পতনের দিন রাতে উত্তর বাড্ডা থানা ঘিরে রাখা জনতার সাথে বেচে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের বন্দুক যুদ্ধের ভিডিও দেখা গেছে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে। পরবর্তিতে সেনাবাহিনী গিয়ে বেঁচে যাওয়া জনাদশেক পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে সেই থানা থেকে। থানার ছাদের উপরে আশ্রয় নেয়া পুলিশের ফোনে জীবন বাচানোর আকুতি’র ভিডিও দেখা গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

https://www.facebook.com/share/r/iSC82unKdBSebUbm/

৪ঠা আগস্ট থেকে ৮ই আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশের ৬২৫টি থানার মধ্যে ৪৫০টি থানা লুট হয়, অগ্নিসংযোগ করে ধ্বংস করা পুলিশের গুরুত্বপূর্ন নথি দস্তাবেজ। লুট হয়েছে ৫ হাজার অস্ত্র এবং ১০হাজারের উপরে গুলি। প্রতি থানাতে গড়ে ৫ জন করে পুলিশ সদস্য মারা গেলেও সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২ হাজারের উপরে। সবচেয়ে বেশী হতাহতের ঘটনা ঘটেছে পুলিশের রিজার্ভ ফোর্স এবং এপিবিএন সদস্যদের উপর। এদের হতাহতের সংখ্যা কোন থানাতেও লিপিবদ্ধ নেই। শুধুমাত্র পুলিশ হেডকোয়ার্টার এই সংখ্যাটা জানে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে পুলিশে কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত ২ লাখ ১২ হাজার ৭২৪ জন সদস্য রয়েছে । বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিপরীতে পুলিশ সদস্যের অনুপাত ১:৮০০।

থানায় কতো পুলিশ মারা গেছে বা মিসিং হয়েছে তার একটা ধারনা পাওয়া যায় সরকার পতনের আড়াইমাসেও থানাগুলো পুরোপুরি সচল করতে না পারায়। এখনও বেশীভাগ থানায় চুরি ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষন এর অভিযোগ সমুহ নেয়া হচ্ছে না, কারন ঘটনা তদন্ত করার লোকবল নাই পুলিশের। আগস্টের ১০তারিখে এই থানাগুলো সচল করতে সেনাবাহিনী নিয়োগ দেয়া হয়। সেদিন সেনাবাহিনীর ২৫ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট কোম্পানির অধিনায়ক শাখাওয়াত খন্দকার বলেছিলেন,

“সেদিন (৫ আগস্ট) প্রচণ্ড জনমানুষের স্রোত ছিল। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যখন কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্বৃত্তরা পুলিশসহ মানুষ হত্যা করছে। তখন আমরা ডিসিশন নিয়েছি থানা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। পুলিশ সদস্যদের বাঁচাতে হবে।“

একইসঙ্গে আজ ২৫শে অক্টোবর, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বলা হয়, ‘লক্ষ্য করেছি যে কিছু নিউজ আউটলেট এবং কিছু ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থানে নিহত পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা সম্পর্কে মিথ্যা এবং ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানে নিহত পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রকৃত তালিকা পুলিশ সদর দপ্তর প্রকাশ করেছে।” একদিকে যেমন জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতের সংখ্যা বাড়িয়ে চলছে সরকার, বিপরীতে নিহত পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা কমাতে কমাতে ৪৪ এ এনে ঠেকিয়েছে। নড়ছেই না সেখান থেকে। কতো হাজার পুলিশ সদস্য আহত, কতো রাজনোতিক নেতাকর্মি হত্যার শিকার হয়েছে সে প্রসঙ্গে আসার তো কোন ফুরসতই নেই উপদেষ্টা পরিষদের।

কিছু নিহত ও আহত পুলিশ সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগস্টের পর থেকে নিহত আহতদের পরিবারের কোন খোজ খবর নেয়া হয়নি সরকার থেকে। ক্ষতিপুরন তো দূরে থাক, সংসারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যাক্তির বেতন ভাতাও পাচ্ছে না পরিবারগুলো। পুলিশের কিছু সিনিয়র সদস্যদের দয়া অনুগ্রহে মানবেতর ভাবে টিকে আছে আহত ও নিহতদের পরিবার।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানো হয়, পুলিশ বিভাগ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যেসব অফিসার বা কনস্টেবল প্রতিবাদ বা সহিংসতার ঘটনায় আহত বা নিহত হয়েছেন তাদের তালিকা রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। যদি কেউ দাবি করেন, গণঅভ্যুত্থানে এই তালিকার বাইরেও পুলিশ নিহতের ঘটনা ঘটেছে সেক্ষেত্রে প্রমাণ সরবরাহের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।

আগস্টের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে বিভিন্ন পত্রিকায় ছিল পুলিশ হত্যার সংখ্যা ও ঘটনার বিবরন। যদিও এই প্রতিবেদন লেখার সময়ে পুরনো সেই সংবাদ আর খুজে পাওয়া যায় নি। বেশিরভাগ সংবাদপত্রই তাদের সাইট থেকে আগস্ট জুড়ে হওয়া সহিংসতার সেই সব খবর সরিয়ে ফেলেছে।

ব্যাক্তি উদ্যোগে দেশে ও দেশের বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি আর ভিডিও আর্কাইভ করা হয়েছে। আশা করা যায়, কোন একদিন পুলিশের সুদিন এলে সেই সকল হত্যার তদন্ত ও বিচার হবে।

 

 

Visited 27 times, 1 visit(s) today