❐ নিজস্ব সংবাদদাতা
রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের কাউরিয়া, বসুপাড়া ও ধেরওয়িল গ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যেই প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি ড্রেন। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় ড্রেনটির একাধিক অংশ ধসে পড়েছে।
আর এ ঘটনায় দায় চাপানো হয়েছে নির্মাণ শ্রমিক ও মিস্ত্রিদের ঘাড়ে।
এ ঘটনায় সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মান নিয়েই প্রশ্ন উঠেনি, বরং আবারও জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে কৃষিজমি। ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং যথাযথ তদারকির অভাবেই এত দ্রুত ড্রেনটি ধসে পড়েছে।
যদিও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজিব মোল্লা বাবু এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নির্মাণশ্রমিকদের কাজের ত্রুটিকে দায়ী করেছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের বিবিজি বিশেষ কিস্তির আওতায় প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রেনটি নির্মাণ করা হয়।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল কাউরিয়া, বসুপাড়া ও ধেরওয়িল গ্রামের বিস্তীর্ণ কৃষিজমির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর করা।
কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই ড্রেনটির বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ায় সেই উদ্দেশ্যই এখন ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ড্রেনের একাধিক অংশের দেয়াল ভেঙে পাশের দিকে হেলে পড়েছে। কোথাও বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ড্রেনের মুখে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি বের হতে পারছে না। ফলে আশপাশের বিল ও ফসলি জমিতে আবারও পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আউয়াল বলেন, কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের আশায় ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র সাত দিনের মাথায় সেটি ধসে পড়ায় মাঠে আবারও পানি জমে রয়েছে। এতে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আরেক কৃষক সলিমউল্লাহ জানান, প্রায় ৫০০ বিঘা জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়েই সেটি ধসে যাওয়ায় শত শত কৃষক আবারও জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফরিদের অভিযোগ, নিম্নমানের ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় রড বা পিলার ছাড়াই দায়সারাভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করায় সামান্য বর্ষণের চাপেই পুরো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
শ্রমিকের ভাষ্য—’চেয়ারম্যানের নির্দেশেই কাজ হয়েছে’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্মাণকাজে যুক্ত এক শ্রমিক জানান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রায় প্রতিদিনই নির্মাণস্থলে উপস্থিত থেকে কাজ তদারকি করেছেন এবং তার নির্দেশনাতেই কাজ পরিচালিত হয়েছে।
ওই শ্রমিক আরও জানান, চেয়ারম্যানের নিজস্ব ইটভাটার ইট নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের ভাটা থেকে আনা ইটের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে রামকান্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজিব মোল্লা বাবু বলেন, নির্মাণকাজে নিম্নমানের কোনো উপকরণ ব্যবহার করা হয়নি।
তার দাবি, যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তবে তা মিস্ত্রিদের কাজের ত্রুটির কারণে হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ড্রেনটি যেহেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই দ্রুত তা মেরামত করা হবে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপমা রায় জানান, ড্রেন ধসে পড়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। উপজেলা প্রকৌশলী ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং চেয়ারম্যানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ড্রেন পুনর্নির্মাণ বা মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তদন্তে যদি নির্মাণে অনিয়ম, অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কাউরিয়া, বসুপাড়া ও ধেরওয়িল গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে শত শত একর জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। নতুন ড্রেন নির্মাণকে ঘিরে কৃষকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল স্থায়ী সমাধানের।
কিন্তু নির্মাণের মাত্র সাত দিনের মাথায় ড্রেন ধসে পড়ায় সেই প্রত্যাশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে শুধু ঠিকাদার বা বাস্তবায়নকারী নয়, তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।
