❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামের উচ্চশিক্ষা ও রাজনীতির অঙ্গনে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা বিতর্ক। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে বসা বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘অবৈধ দখল’ ও ‘আদালত অবমাননার’ গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান বোরহানুল হাসান চৌধুরী সালেহীনের প্রকাশিত একটি দীর্ঘ বিবৃতিতে, ৫টি অকাট্য আইনি সত্য ও ঐতিহাসিক দলিল উপস্থাপন করে বর্তমান চসিক প্রশাসনের ভূমিকাকে ‘বেআইনি ও ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২ অনুযায়ী, যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রাথমিক শর্ত হলো ৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (Endowment Fund)। নথিপত্র অনুযায়ী, এই বিশাল তহবিল তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর একক ও নিজস্ব উদ্যোগে সংগৃহীত হয়েছিল। এই তহবিলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কোনো আর্থিক অবদান নেই।
বর্তমান বোর্ডকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, চসিক যদি অর্থায়ন করে থাকে তবে তার একটি চেক বা আর্থিক নথি যেন জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়।
২০০২ সালের ২১শে জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শাখা-১৪ থেকে জারি করা এক স্মারকে (স্মারক নং- শিম/শাঃ১৪/৮ বেঃবিঃ-১৫/২০০১/২৫) বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ২(ঙ) নম্বর শর্তে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, “সিটি কর্পোরেশনের সাথে ইতোপূর্বে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউটের কোন সম্পর্ক থাকিবে না।”
উক্ত চিঠিতে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ‘উদ্যোক্তা’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। ফলে মন্ত্রণালয়ের শর্তানুযায়ী প্রথম থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সিটি কর্পোরেশনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা মালিকানা অধিকার ছিল না বলে দাবি করা হচ্ছে।
২০১৫ সালে চসিকের তৎকালীন প্রশাসন এবং ইউজিসি-এর একটি চিঠির প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন চৌধুরী আদালতের শরণাপন্ন হন। ২০১৬ সালের জুনে মহামান্য হাইকোর্ট ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’ এবং ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’ পর্যালোচনা করে রায় দেন যে— “চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইনি সুযোগ নেই।” এই রায়ের পর ইউজিসি তাদের বিতর্কিত চিঠি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার। বর্তমানে মামলাটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে ‘লিভ টু আপিল’ (Leave to Appeal) পর্যায়ে বিচারাধীন রয়েছে। চসিক এখনো হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার চূড়ান্ত অনুমতি পায়নি। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় জোরপূর্বক ‘বোর্ড অব ট্রাস্টি’ পুনর্গঠন করা দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবমাননা (Contempt of Court) এবং এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
আইনি যুক্তিতে বলা হয়, প্রবর্তক মোড়ের ক্যাম্পাস-১ ও ক্যাম্পাস-২ এর জায়গাটি চসিক থেকে বৈধভাবে ইজারা (Lease) নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রশ্ন তোলা হয়েছে— “বিশ্ববিদ্যালয় যদি চসিকেরই হবে, তবে নিজের ঘরের জন্য কেউ কি নিজেকে ভাড়া দেয়?”
এছাড়া শিক্ষার্থীদের ফি’র টাকায় নির্মিত ভবন দুটিকে সম্প্রতি ভেঙে ফেলার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ার পাঁয়তারা চলছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
ঝুঁকিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ
রাজনৈতিক ও আইনি ক্ষমতার এই রশি টানাটানির মাঝখানে পড়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী। বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, এই আইনি জটিলতার কারণে যদি ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম এবং সার্টিফিকেটের বৈধতা সংকটে পড়ে, তবে এই ‘অবৈধ’ বোর্ড গঠনের কুশীলবদেরই এর সম্পূর্ণ দায়ভার নিতে হবে।
একটি স্বায়ত্তশাসিত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার জোরে দখলের এই সংস্কৃতি ভবিষ্যতের জন্য এক বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে বলে বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
