“জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছিল ভুল”- অনুতপ্ত এক জুলাইযোদ্ধার শাপমোচন

“জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছিল ভুল”- অনুতপ্ত এক জুলাইযোদ্ধার শাপমোচন
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

“দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করে যে আন্দোলন, সেই জুলাই আমার দরকার নাই” — নিয়াভ সারাই, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

 

জুলাই আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে এখন গভীর অনুশোচনায় ভুগছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নিয়াভ সারাই। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ঘুমাতে পারছেন না তিনি। কারণ, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন, বাস্তবে তার ঠিক উল্টো চিত্রই দেখছেন এখন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি সরাসরি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং আন্দোলনে যোগ দেওয়াকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বলে স্বীকার করেছেন।

 

“আসল উদ্দেশ্য না বুঝেই গিয়েছিলাম”

নিয়াভ জানান, জুলাই আন্দোলনে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আবেগের বশে, প্রকৃত উদ্দেশ্য না বুঝেই। ৫ আগস্টের পর তিনি খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে আন্দোলনকারীদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হবে।

তিনি বলেন, “কিন্তু সেই দাবিগুলো বাস্তবায়ন তো দূরে থাক, এসব নিয়ে তারা ভাবেও নাই।”

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে ‘৭১-বিরোধী লেখা দেখে মর্মাহত

আন্দোলনের সময় “বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই” স্লোগান উঠেছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে বলে জানান তিনি।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে “নিজামীর বাংলায় ৭১-এর ঠাঁই নাই” এবং “নিজামীর বাংলায় মুক্তিযোদ্ধার ঠাঁই নাই” জাতীয় লেখা দেখে মর্মাহত হন তিনি।

ক্ষোভের সাথে তিনি বলেন, “যে ৭১-এর জন্য আমার দেশের নাম বাংলাদেশ, সেই ৭১ নিয়েই চেতনা করব না তো কী ২৪ নিয়ে করব? সেই জুলাই আমার দরকার নাই।”

 

“সবকিছু ছিল মেটিকুলাস ডিজাইন”

নিয়াভ দৃঢ়ভাবে বলেন, জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে যা হয়েছে সবকিছু পরিকল্পিত ছিল। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল একটি “মেটিকুলাস ডিজাইন” — যা ড. ইউনূস, মাহফুজসহ একাধিক সমন্বয়ক নিজেদের বক্তব্যে স্বীকার করেছেন।

তিনি আরও বলেন, “এতগুলো ছাত্র, জনগণ, পুলিশ — সব ধরনের মানুষ মারা গেছে শুধুমাত্র এই পরিকল্পিত নকশার জন্যই।” যারা গুপ্তভাবে ৭.৬২ মিলিমিটার গুলি চালিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিচার দাবি করেন তিনি। ৫ আগস্টের পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে আন্দোলনের মূল নেতাদের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আগে থেকেই যুক্ত ছিলেন।

সেনা কর্মকর্তার কন্যা, বাবার পরামর্শেই ক্ষমা চাইলেন

নিয়াভের বাবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেজর, ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের অফিসার কমান্ডিং হিসেবে দায়িত্বরত। বাবার কাছেই তিনি জানতে চেয়েছিলেন — ভুল করলে কী করা উচিত। বাবার পরামর্শ ছিল ক্ষমা চাওয়া। সেই পরামর্শ মেনেই তিনি প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

“শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনা নিজেই”

একজন নারী হিসেবে তিনি জানান, শেখ হাসিনার শাসনামলেই তিনি বেশি নিরাপদ অনুভব করতেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে দেশের নারীদের নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন তিনি।

তাঁর ভাষায়, “এই জাতির জন্য শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনা নিজেই।”

 

ছাত্র পরিচয়ের আড়ালে চলছে সন্ত্রাস

নিয়াভ উদ্বেগ জানান যে কিছু ব্যক্তি ‘ছাত্র’ পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মব, সহিংসতা ও চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। অথচ অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভয়ে বা দ্বিধায় প্রতিবাদ করছেন না।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ছাত্র হলেই অপরাধের ঊর্ধ্বে নয় কেউ। অপরাধ করলে একই আইন সবার জন্য প্রযোজ্য।

 

প্রায়শ্চিত্তের প্রতিজ্ঞা

বক্তব্যের শেষে নিয়াভ প্রতিজ্ঞা করেন — দেশের মা-বোনদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যখনই সময় আসবে, তিনি জীবন দিয়ে হলেও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। তাঁর মতে, সেদিনই তিনি নিজের অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারবেন।

 

নিয়াভ সারাইয়ের এই আত্মস্বীকৃতি এমন এক সময়ে এলো, যখন একে একে অনেক জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণী নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় আসা শক্তিগুলোর কাছ থেকে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি এখন অনেকের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Visited 21 times, 1 visit(s) today