❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ও পেডিয়েট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) এখন এক নীরব ডেথ ট্র্যাপ বা মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।
হাম এবং হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কারণ, তাদের শরীরে জীবনরক্ষাকারী কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই আর কাজ করছে না। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুধু মে মাসের প্রথম ১৭ দিনেই প্রাণ হারিয়েছে ৬০টি নিষ্পাপ শিশু! এর আগে এপ্রিলেই মারা গেছে আরও ৯৫ জন। অর্থাৎ, মাত্র ৪৫ দিনের ব্যবধানে ১৫৫টি মায়ের কোল খালি হয়ে গেছে।
রক্তের রিপোর্টে ভয়ঙ্কর ‘সুপারবাগ’ ব্যাকটেরিয়া
চমেক হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক শিশুর রক্তের কালচার পরীক্ষার রিপোর্টে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো সত্য। চিকিৎসকেরা দেখছেন, শিশুদের রক্তে বাসা বেঁধেছে ‘Burkholderia cepacia’ নামের এক অতি-প্রতিরোধী ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া।
ল্যাব টেস্টের রিপোর্টে দেখা গেছে, চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত অত্যন্ত শক্তিশালী ১৩টি অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন- Meropenem, Imipenem, Amikacin, Ciprofloxacin) এই জীবাণুর বিরুদ্ধে পুরোপুরি অকার্যকর। চিকিৎসকেরা একে বলছেন ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বা সুপারবাগের আক্রমণ।
ভয়াবহ ব্যাপার হলো, চিকিৎসকদের মতে এই মরণঘাতী সংক্রমণের একটি বড় অংশ ছড়াচ্ছে স্বয়ং হাসপাতাল থেকেই! পিআইসিইউতে থাকা শিশুদের ভেন্টিলেটর বা ক্যানুলার মাধ্যমে এই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
১১ হাজার টাকার ক্যানুলা হাতে স্তব্ধ পিতা, ওপারে একমাত্র কন্যাসন্তান
হাসপাতালের এই যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে বুকফাটা দৃশ্যটি ছিল কক্সবাজারের মোহাম্মদ আলমের। তার ৯ মাসের কন্যাসন্তান সুরাইয়া হামের জটিলতা থেকে মস্তিষ্কের প্রদাহে (মিজেলস এনসেফালাইটিস) আক্রান্ত ছিল। তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে তার অতি জরুরি ছিল ‘হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা’।
২০ শয্যার পিআইসিইউতে ২০টি শিশুই যখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, তখন সেখানে ক্যানুলা ছিল মাত্র ১২টি।
হাসপাতালে সংকটের কারণে নিরুপায় বাবা ধারদেনা করে বাইরে থেকে ১১ হাজার টাকা দিয়ে একটি ক্যানুলা কিনে আনেন। কিন্তু সেই ক্যানুলা হাতে নিয়ে যখন তিনি পিআইসিইউতে ঢোকেন, ততক্ষণে সুরাইয়া পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে। সেই ক্যানুলা হাতে নিয়ে ওই বাবা কতক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই উত্তর আজ কারও জানা নেই।
টিকা না দেওয়ার মাশুল গুনছে পুরো একটি প্রজন্ম
ডা. ধীমান চৌধুরী (শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের কনসালট্যান্ট) জানান, বর্তমানে পিআইসিইউর ২০টি বেডের প্রতিটি শিশুই চরম সংকটাপন্ন এবং তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। শিশুদের জিসিএস (চেতনার স্তর) ৮-এর নিচে নেমে যাওয়ায় তাদের এখানে আনা হয়েছে।
অনেকেই ‘জিবিএস’ নামের বিরল স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিকমতো হামের টিকা না দেওয়ার কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ ব্যাকটেরিয়াও শরীরে প্রবেশ করে রূপ নিচ্ছে অপ্রতিরোধ্য সুপারবাগে।
এটি কেবল কোনো সাধারণ রোগ নয়, বরং সচেতনতার অভাবে পুরো একটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এক জীবন্ত ট্র্যাজেডি।
