বিডি ডাইজেস্ট প্রতিবেদক
বিশ্বব্যাপী ভোক্তা চাহিদার ধীরগতি, তীব্র মূল্যস্ফীতির চাপ এবং খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতির প্রভাবে ২০২৬ সালের শুরুতেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ইউরোতে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কম।
ইউরোপের বাজারের এই নেতিবাচক প্রবণতা বৈশ্বিক পোশাক রফতানিকারকদের জন্যই উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে। তবে বড় রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী পরিস্থিতি, ছাত্র-জনতার নাম দিয়ে বিভিন্ন কারখানায় ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইইউর পোশাক আমদানিতে মূল্যমান কমার পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, আমদানির পরিমাণ বা ভলিউম কমেছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, গড় ইউনিট মূল্য (ইউরো/কেজি) কমেছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের ক্রেতারা শুধু কম পোশাক কিনছেন না, একইসঙ্গে কম দামে পণ্য কিনছেন।
ইউরোপের ভোক্তারা এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে পোশাকের মতো অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমে গেছে। অন্যদিকে, বড় বড় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত মজুত এড়াতে আগের তুলনায় আরও সতর্কভাবে ক্রয়াদেশ দিচ্ছে।
এই বৈশ্বিক মন্দার মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ইউরোতে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইউরো। এতে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রফতানি কমে ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ কম। রফতানির পরিমাণ ও ইউনিট মূল্য উভয় ক্ষেত্রেই পতন হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশও ইইউ বাজারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক মন্দার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই খাতের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বর্তমান বিএনপি সরকার এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী আমল থেকে শুরু হওয়া প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশের গর্ব তৈরি পোশাক খাত আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদে এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার নাম ভাঙিয়ে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ‘মব’ বা উগ্রপন্থী বিশৃঙ্খলার কারণে একের পর এক পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সাভার, গাজীপুর ও আশুলিয়ার মতো বড় শিল্পাঞ্চলগুলোতে ধারাবাহিক শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়া, কারখানা ভাঙচুর এবং জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার কারণে বিদেশি ক্রেতারা আস্থা হারিয়েছেন। সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে অনেক নামী ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে তাদের ক্রয়াদেশ সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে গেছে।
ইইউ বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা অন্যান্য প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যেও দেখা গেছে, তবে তা বাংলাদেশের মতো এতোটা বিপর্যয়কর নয়। চীন ৪.২০ বিলিয়ন ইউরো (আয় কমেছে ৪.০১%) ভলিউম ১.৩৪% বাড়ালেও ইউনিট মূল্য ৫.২৭% কমাতে হয়েছে। তুরস্ক ২২.৯১% রফতানি কমেছে ইউরোপের বাজারে বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। ভিয়েতনাম ৭১১.৭৩ মিলিয়ন ইউরো (আয় কমেছে ২.০৬%) ইউনিট মূল্য ৬.৫৬% বাড়াতে পেরেছে, উচ্চমূল্যের পণ্যে জোর দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রফতানি কাঠামো এখনও তুলনামূলকভাবে নিম্ন ও মধ্যমূল্যের পোশাকনির্ভর। ফলে ইউরোপের বাজারে যখন মূল্য কমানোর চাপ বাড়ে, তখন বাংলাদেশের রফতানিকারকদের মুনাফার মার্জিন দ্রুত কমে যায়। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি এবং মব সংস্কৃতির কারণে উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছে। বর্তমানে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি লড়াই করছে।
রফতানিকারকরা বলছেন, ইউরোপের বাজার পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য ইতিহাসের অন্যতম কঠিন একটি বছর হয়ে উঠবে। বর্তমানে শুধু রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই নয়, বরং শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সংকট উত্তরণে পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকে বিনিয়োগের পাশাপাশি কারখানায় সব ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন করা প্রয়োজন।
