❐ বিশেষ প্রতিবেদক
ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা সাম্প্রতিক এক ফেসবুক পোস্টে মার্কিন ভিসা নীতির প্রতি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর প্রায় ৮৫ হাজার H-1B ভিসা ইস্যু করে, যা বৈধ কাজের অনুমতি। কিন্তু গত বছর বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৬৬ জন এই ভিসা পেয়েছেন, অথচ ভারত থেকে এসেছে ৪০-৪৫ হাজার। তিনি এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশের আইটি খাতের দুর্বলতা, বুয়েট ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের অভাবের পাশাপাশি অদ্ভূতভাবে শেখ হাসিনা আমলের ‘দুর্নীতিকেও’ দায়ী করেছেন।
তার এই পোস্টটি সাধারণ পাঠকের কাছে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় একটি উদ্বেগ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, মোর্তোজার অতীত ভূমিকা বিবেচনায় এটি নিছক ইমেজ রক্ষার চেষ্টা বলে মনে হয়।
যিনি ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দূতাবাসের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হয়েছেন, তিনি নিজেই এমন একটি প্রশাসনের প্রতিনিধি যার আমলে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তি: ঔপনিবেশিক বন্ধন?
ইউনূস সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত Reciprocal Trade Agreement নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এটিকে একপেশে ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর বলে অভিহিত করেছেন। চুক্তির কিছু ধারা বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি, শক্তি, কৃষি ও জাতীয় নিরাপত্তা খাতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সমালোচকরা একে “ঔপনিবেশিক বন্ড” বলে বর্ণনা করেছেন, যা দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের হাত বেঁধে দিতে পারে।
যে দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে মোর্তোজা দায়িত্ব পালন করছেন, সেই প্রশাসনের আমলে এই চুক্তি হয়েছে। অথচ এখন তিনি H-1B ভিসার সীমিত সংখ্যা নিয়ে মৃদু অসন্তোষ প্রকাশ করে নিজেকে বাংলাদেশের স্বার্থের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। যা স্পষ্ট দ্বিচারিতা।
ভারতের সাফল্যের পেছনে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, ডায়াসপোরা নেটওয়ার্ক এবং কর্পোরেট লেভেলে প্রভাবও কাজ করেছে। বাংলাদেশ সেই তুলনায় পিছিয়ে আছে—এটি সত্য, কিন্তু এর সমাধান দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার হিসাবে বাংলাদেশকে তুলে ধরার কাজটি যথাযথভাবে করেছেন গোলাম মোর্তোজা?
যেখানে তিনি ব্যাস্ত ছিলেন নিজের বেতন-ভাতাকে সচিব পর্যায়ে নিয়ে যেতে, দুতাবাসের কর্মকাণ্ডে গরহাজির থেকেও নিজের বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় সুবিধা বৃদ্ধিতে!
প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ ও ভূমিকা
গোলাম মোর্তোজা একজন সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ইউনূস সরকারের অধীনে দূতাবাসের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের পর থেকে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যে ব্যক্তি মার্কিন-সমর্থিত বা প্রভাবিত প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তিনি যখন মার্কিন ভিসা নীতির সমালোচনা করেন, তখন তা অনেকের কাছে লোক দেখানো বলে মনে হয়।
বিশেষ করে যখন তার আমলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে “জিম্মি” করার মতো চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে, কূটনীতিকরা দেশের স্বার্থরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন—শুধু নির্বাচিত সরকারের নয়, জনগণের স্বার্থ। গোলাম মোর্তোজার পোস্টটি সেই প্রত্যাশার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয়।
এটি বরং তার নিজের এবং তার নিয়োগকারী প্রশাসনের ব্যর্থতা আড়াল করে নিজেকে দেশপ্রেমী ও দেশবান্ধব হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা হিসাবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অভিজ্ঞ সাবেক কূটনীতিকরা।
বাংলাদেশের আইটি খাতসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং স্বাধীন কূটনীতি—এগুলোই স্থায়ী সমাধান। একইসাথে দেশের স্বার্থবিরোধী যে কোন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যিনি সোচ্চার হবার কথা, সেই সময়েই তিনি ছিলেন নীরব। কূটনীতিক মানে ফেসবুক পোস্টে হতাশা প্রকাশ করে ইমেজ সংশোধনের চেষ্টা নয়।
