জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বোঝা বাড়লেও ‘লোকসান’ তত্ত্ব নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন

জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বোঝা বাড়লেও ‘লোকসান’ তত্ত্ব নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাজেট ব্যবস্থাপনায়। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে সরকারকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে—যা ভর্তুকির চাপকে দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, বিদ্যমান বাজেট কাঠামো এই চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। জ্বালানি খাতের ব্যয়, ভর্তুকি এবং আর্থিক ভারসাম্য নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে, যা ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

মূল্যবৃদ্ধি ও বাস্তবতার ফারাক

সংঘাত শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৭০–৭২ ডলার, যা এখন ১০০–১১০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে আরও বড় চাপ তৈরি হয়েছে পরিশোধিত জ্বালানির দামে অস্বাভাবিক লাফে—যা ৮৫ ডলার থেকে বেড়ে ২০০ ডলারের ওপরে চলে গেছে। একইভাবে এলএনজি বাজারেও দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিনির্ভর আমদানি কাঠামো কতটা কার্যকর থাকছে?

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রচলিত সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে এবং সরকারকে ক্রমেই স্পট মার্কেটনির্ভর হতে হচ্ছে, যেখানে দাম বেশি এবং ঝুঁকিও বেশি।

স্পট মার্কেটের ফাঁদে বিপিসি

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বর্তমানে উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনছে। অনেক ক্ষেত্রে এই দাম পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। কিন্তু দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয় না করায় এই ব্যবধান সরাসরি আর্থিক চাপ হিসেবে জমা হচ্ছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই চাপ কতটা প্রকৃত ‘লোকসান’ এবং কতটা ‘নীতিগত মূল্য নিয়ন্ত্রণের খরচ’? সরকার এটিকে ভর্তুকি হিসেবে দেখালেও, অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন—এটি আংশিকভাবে অতীতের মুনাফা সমন্বয়ের প্রক্রিয়া।

ভর্তুকি না মুনাফা সমন্বয়?

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিপিসির বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি লোকসান বলা বিভ্রান্তিকর। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে সংস্থাটি উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে, যা এখন উচ্চমূল্যের আমদানি সামাল দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তার যুক্তি অনুযায়ী, বিপিসি যেহেতু অতীতে মুনাফার একটি অংশ সরকারকে দিয়েছে, এখন সেই অর্থ নিজস্ব ব্যয়ে ব্যবহার করায় কার্যত সরকারই পরোক্ষভাবে অর্থটি ফিরিয়ে দিচ্ছে। ফলে এটিকে সরাসরি ভর্তুকি হিসেবে দেখানো অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসির মুনাফা ছিল প্রায় ৪,৭০০ কোটি টাকা এবং আগের বছর ছিল ৩,২০০ কোটি টাকা। এই সঞ্চিত সক্ষমতা বর্তমান সংকটে কিছুটা ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করছে।

বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ

চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২২,৫২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পর্যাপ্ত নয় বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে এলএনজি খাতে ৬,০০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দ্রুতই শেষ হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট সুবিধা—বিশেষত আইটিএফসি—থেকে ঋণ নিয়ে আমদানির যে প্রচলিত ব্যবস্থা ছিল, সেটিও স্পট মার্কেটনির্ভর কেনাকাটার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ছে। ফলে বিপিসিকে নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা সংস্থাটির তারল্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

মূল্য না বাড়ানোর রাজনৈতিক অর্থনীতি

সরকার আপাতত জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর নীতিতে অটল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে মূল্য স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ না বাড়ে।

তবে এই সিদ্ধান্তের একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে এটি জনগণকে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজেট ঘাটতি, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং জ্বালানি খাতের টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

সামনে কী?

বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত কেবল বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়—এটি নীতিগত সীমাবদ্ধতা, সরবরাহ বৈচিত্র্যের অভাব এবং মূল্য নির্ধারণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সম্মিলিত ফল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ভর্তুকি বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল—যেখানে আমদানি উৎস বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, এবং বাস্তবসম্মত মূল্য কাঠামো পুনর্বিন্যাস অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

অন্যথায়, বর্তমান সংকট সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া গেলেও ভবিষ্যতে একই ধরনের ধাক্কা আরও বড় আকারে ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

Visited 10 times, 1 visit(s) today