ফ্যাক্ট চেক: প্লাস্টিকের চাল নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক, প্রকৃত সত্য কী?

ফ্যাক্ট চেক: প্লাস্টিকের চাল নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক, প্রকৃত সত্য কী?
শেয়ার করুন

❐ ফিচার ডেস্ক


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝে মাঝেই প্লাস্টিকের ডিম, প্লাস্টিকের চালসহ বিভিন্ন ইস্যুতে হাইপ তৈরি হয়। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা থেকে হাতাহাতি-মারামারির ঘটনাও ঘটে বিভিন্ন স্থানে।

প্লাস্টিক দিয়ে ডিম বা চাল কি আসলেই তৈরি করা সম্ভব? তৈরি করা হলেও সেটা কি আদৌ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে? এই প্রশ্নটাই গুরুত্বপূর্ণ। খামার থেকে যে দামে ডিম উৎপাদন হয়, ‘প্লাস্টিক দিয়ে’ কিংবা গবেষণাগারে একই রকম ডিম তৈরি করে (যা আদৌ সম্ভব কিনা প্রমাণ মেলেনি) বাজারজাত করা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মনে হয়নি বিশেষজ্ঞদের। তাই একে Hoax বা গুজব আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এবার চালের ক্ষেত্রে আসা যাক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, কেউ দাবি করছেন- সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে দরিদ্রদের জন্য বিতরণকৃত চালের মাঝে প্লাস্টিকের চাল পাওয়া গেছে। তারা সেই চাল চামচে নিয়ে আগুনের তাপে ধরে দাবি করছেন এসব প্লাস্টিকের চাল। এসব নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। জনমনে ছড়িয়ে পড়েছে ভীতি ও আতঙ্ক।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বশীলদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্লাস্টিকের চাল বলে কিছু নেই। হালকা হলদেটে দেখতে এই চালের নাম পুষ্টিচাল। বিশ্বজুড়ে প্রায় শত বছর ধরে অনুমোদিত পুষ্টিচাল প্রচলিত।

আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশে ২০১৬ থেকেই দেশের দরিদ্র মানুষকে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে এই পুষ্টিচাল বিতরণ করে আসছিল।

পুষ্টিচাল আসলে কী? কেন খাবেন?

জেনে রাখা প্রয়োজন, সাধারণ চালের সঙ্গে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-বি১২, ভিটামিন-বি৯ (ফলিক অ্যাসিড), আয়রন এবং জিঙ্ক উপাদান সমৃদ্ধ দানাদার চাল বা কার্নেল উৎপাদন করা হয়। পরে সাধারণ চালের সঙ্গে ১০০:১ অনুপাতে কার্নেল মিশিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল (ফর্টিফায়েড রাইস) প্রস্তুত করা হয়।

প্রতি ১০০টি সাধারণ চালের সঙ্গে একটি পুষ্টিচাল অর্থাৎ ১০০ কেজিতে ১ কেজি হারে পুষ্টিচাল মেশানো হয়। এ মিশ্রণ সয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে থাকে। এ চালের মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়, কিন্তু চালের স্বাদের কোনো পরিবর্তন হয় না।

যেহেতু এ চালের সঙ্গে আরও ৬ ধরনের পুষ্টি মেশানো হয়, এজন্যই একে পুষ্টিচাল বলা হয়। এ চালে শুধু কার্বোহাইড্রেট বা প্রোটিনই থাকে না, আছে আরও পুষ্টিগুণ। সবগুলো উপাদানই শরীরের জন্য খুব উপকারী। অন্যদিকে সাদা চালে এতো বেশি পুষ্টিগুণ থাকে না।

ফর্টিফায়েড চালে সাধারণ চালের তুলনায় বেশি মাত্রায় থায়ামিন ও নিয়াসিন আছে। এ ছাড়াও ফাইবার ও প্রোটিনের মাত্রাও অনেক। পাশাপাশি ম্যাগনেশিয়াম, দস্তা, আয়রন, ফোলেট ইত্যাদি পুষ্টি উপাদান আছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাইস ফর্টিফিকেশন (চাল সংশোধন) করা হয়। যার ফলে উৎপাদিত হয় পুষ্টিচাল। এ চালে ভিটামিন বা খনিজ উপাদান ভরপুর। এ কারণেই অপুষ্টির শিকার বা স্বল্প আয়ের দেশগুলো পুষ্টিচাল বিতরণ করে থাকে খুব কম মূল্যে।

এ চাল নিয়মিত খেলে শরীরের দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন রোগ থেকেও মুক্তি মেলে। যেমন ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের ঝুঁকি কমে। এ চালে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে। যা শরীরে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি থেকেও মুক্তি দিতে পারে।

পুষ্টিচাল যেভাবে তৈরি হয়

সবচেয়ে উন্নত ও পুষ্টিমানসম্পন্ন ধান ফর্টিফিকেশনের (সংশোধন) মাধ্যমেই তৈরি হয় পুষ্টিচাল। এরপর এ চালের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, অ্যামাইনো অ্যাসিড ও অন্যান্য পুষ্টির সংযোজন ঘটানো হয়। ধান কাটার পর সেগুলো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিষ্কার করে চাল তৈরি হয়।

এরপর চালগুলোকে ভালোভাবে ধুয়ে ও ভিজিয়ে রেখে জ্বাল দেওয়া হয়। এতে চালের গায়ে লেগে থাকা ময়লা-আবর্জনা দূর হয়, সঙ্গে ব্যাকটেরিয়া থাকলেও চলে যায়। এরপর চালগুলো শুকানো হয়। এ চালের রং কিন্তু কখনোই ধবধবে সাদা হয় না। হালকা হলুদ রঙের হয়ে থাকে। তবে ব্রাউন রাইসের মতো খয়েরি হয় না।

যেসব দেশে পুষ্টিচাল খাওয়া হচ্ছে

৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ চাল জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, পানামা, পাপুয়া নিউগিনি, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ এবং ফিলিপাইনে রাইস ফর্টিফিকেশন এখন বাধ্যতামূলক।

২০০১ সালে কোস্টারিকার সব চালে ভিটামিন বি (থায়ামিন), ভিটামিন বি (নায়াসিন), ভিটামিন ই, ফলিক অ্যাসিড, সেলেনিয়াম ও দস্তা মেশানো হয়। এরপর থেকে সেখানকার জনগণের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেছে। অ্যানিমিয়ার সমস্যা থেকেও তারা মুক্তি পেয়েছেন।

প্লাস্টিকের চাল পোড়ানো

বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে স্টিলের চামচে কিছু চাল রেখে গ্যাস বার্নারে ধরে চাল পুড়িয়ে দেখিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করা হচ্ছে- এটি প্লাস্টিকের চাল। যা বিভ্রান্তিকর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকের তৈরি হলে চাল পুরোপুরি গলে তরল হয়ে যাওয়ার কথা এত তাপে। অথচ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, চাল গলেনি, আগুনের গরমে উত্তপ্ত স্টিলের চামচে রাখা চাল স্রেফ পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ভাত রান্নার সময় অসাবধানতাবশতঃ পাতিলে পুড়ে গেলে যেমন হয়, ঠিক সেরকম।

প্লাস্টিক হলে গলে তরল আকার ধারণ করত। তাই প্লাস্টিকের চাল বলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

Visited 12 times, 1 visit(s) today