পাকিস্তানি ও দোসরদের হাতে নিধন-নিপীড়নের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ

পাকিস্তানি ও দোসরদের হাতে নিধন-নিপীড়নের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


বাংলার মানস সন্তানকে বিনাশ করতে কুখ্যাত পাক সামরিক চক্র ও তাদের অনুগ্রহলোভী সহযোগীরা যে ব্যাপক চক্রান্তে লিপ্ত হয় তার অন্যতম নিদর্শন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্যাতন। ২৫শে মার্চ রাত্রির নির্বিচারে হত্যা থেকে শুরু করে কয়েক পর্যায়ে এই নির্যাতন সংঘটিত হয় এবং ক্রমেই তা এক সুসংহত রূপ লাভ করে।

ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চিন্তার অনুসারী ও খুনি সরকারের তোষামোদবিরোধী প্রতিটি শিক্ষক তাদের রোষানলে পতিত হয় ও শেষ আঘাতে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তাদের সবাইকে হত্যা করার এক পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু বেশ কিছুসংখ্যক শিক্ষক আগেই দেশত্যাগ করায় ও পাক বাহিনীর আকস্মিক পরাজয় বরণে এই মহা পরিকল্পনার অংশবিশেষ মাত্র কার্যকরী হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্যাতনের একটি চিত্র নিচে দেওয়া গেল।

মার্চ-এপ্রিলে যাদের হত্যা করা হয়

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ও তার কাছাকাছি সময়ে যাদের হত্যা করা হয়েছিল তারা হলেন:

১। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শন),
২। অধ্যক্ষ এ এন এম মনিরুজ্জামান (সংখ্যাতত্ত্ব),
৩। ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজী),
৪। ড. ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান),
৫। জনাব এ মুক্তাদির (ভূবিদ্যা),
৬। জনাব শরাফত আলী (অংক),
৭। জনাব এ আর কে খাদেম (পদার্থ বিদ্যা),
৮। শ্রী অনুদ্বেপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থ বিদ্যা),
৯। জনাব এম সাদাত আলী (শিক্ষা গবেষণা),
১০। জনাব এম এ সাদেক (শিক্ষা এ গবেষণা)।

চাকরি থেকে বরখাস্ত

পাকিস্তানি হানাদাররা কয়েকজন শিক্ষককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। তারা হচ্ছেন:

১। ড. এ বি এম হাবিবুল্লাহ (ইসলামের ইতিহাস),
২। ড. এনামুল হক (বাংলা)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্যপদ থেকে বহিষ্কৃত হন:

১। ড. এনামুল হক ও
২। ড. কুদরত-ই-খুদা।

যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয় ও রমনা হাজতে, দ্বিতীয় রাজধানীতে অবস্থিত পিওডব্লিউ কেজ ও ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয় তারা হচ্ছেন:

১। ড. আবুল খয়ের (ইতিহাস),
২। জনাব রফিকুল ইসলাম (বাংলা),
৩। জনাব আহসানুল হক (ইংরেজী),
৪। জনাব সাদউদ্দিন (সমাজ বিজ্ঞান),
৫। জনাব শহিদুল্লাহ (অংক),
৬। জনাব রাশিদুল হাসান (ইংরেজী)।

যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি করা হয় কিন্তু আত্মগোপন করে অথবা দেশ ত্যাগ করে বাঁচেন তারা হচ্ছেন:

১। ড. আহমদ শরিফ (বাংলা),
২। ড. ওয়াজিউর রহমান।

যাদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ সহ ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়:

১। জনাব আবদুর রাজ্জাক (রাষ্ট্র বিজ্ঞান)।
২। ড. মোজাফফর আহমাদ চৌধুরী (রাষ্ট্র বিজ্ঞান),
৩। ড. সারওয়ার মুরশিদ (ইংরেজী)।

চাকরি থেকে বরখাস্ত ও আটক রাখার আদেশপ্রাপ্ত:

১। ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (বাংলা)।

যাদেরকে সরকারিভাবে সাবধান করে দেয়া হয়:

১। অধ্যক্ষ মুনির চৌধুরী (বাংলা),
২। ড. নীলিমা ইব্রাহীম (বাংলা),
৩। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরেজী)

যে সমস্ত হাউজ টিউটরকে জেরার জন্য ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়:

১। জনাব গিয়াসউদ্দিন আহমদ (মহসিন হল),
২। জনাব জহুরুল হক (মহসিন হল)।

১৪ই ডিসেম্বর আল বদর কর্তৃক ধৃত হয়ে যারা নিহত হন

১। অধ্যক্ষ মুনির চৌধুরী (বাংলা),
২। জনাব মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা),
৩। জনাব আনোয়ার পাশা,
৪। ড. আবুল খায়ের (ইতিহাস),
৫। মিঃ সন্তোষ ভট্টাচার্য (ইতিহাস),
৬। জনাব গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস),
৭। জনাব রাশিদুল হাসান (ইংরেজী),
৮। ড. ফয়জুল মহী (শিক্ষা ও গবেষণা)।

আল বদর যাদের খুঁজে পায়নি:

১। ড. নীলিমা ইব্রাহীম (বাংলা),
২। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরেজী),
৩। জনাব আহসানুল হক (ইংরেজী),
৪। জনাব সাদউদ্দিন (সমাজ বিজ্ঞান),
৫। ড. মনিরুজ্জামান মিয়া (ভূগোল),
৬। জনাব শহিদুল্লাহ (অংক),
৭। জনাব ওয়াকিল আহমদ (বাংলা),
৮। ড. আখতার আহমদ (শিক্ষা ও গবেষণা),
৯। জনাব জহুরুল হক (দর্শন),
১০। ড. এস ইসলাম (ইঃ ইতিহাস),
১১। ড. লতিফ (শিক্ষা ও গবেষণা)।

উল্লেখিত শিক্ষকদের অনুসন্ধান করা ছাড়াও তাদের উপর হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়। আলবদর সদস্য আসরাফুজ্জামান খানের ডায়রিতে (পূর্বদেশ, ১১ই জানুয়ারী, ১৯৭২)।

আলবদর আরো যাদের খোঁজ করেছিল, তারা হচ্ছেন:

১২। জনাব আবদুল হাই (দর্শন),
১৩। ড. এম আর তরফদার (ইঃ ইতিহাস),
১৪। জনাব রফিকুল ইসলাম (বাংলা),
১৫। ড. তরিমত হোসেন (ভূতত্ত্ব) ইত্যাদি।

যারা দেশ ত্যাগ করেন:

১। ড. সরোয়ার মুরশেদ (ইংরেজী),
২। ড. আনিসুর রহমান (অর্থনীতি),
৩। জনাব রহমান সোবহান (অর্থনীতি),
৪। ড. ওয়াহিদুল হক (অর্থনীতি),
৫। ড. মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী (রাষ্ট্র বিজ্ঞান),
৬। ড. এ বি এম হাবিবুল্লাহ (ইঃ ইতিহাস),
৭। ড. অজয় রায় (পদার্থ বিদ্যা),
৮। জনাব নূর মোহম্মদ মিয়া (রাষ্ট্র বিজ্ঞান),
৯। ড. বেলায়েত হোসেন (পদার্থ বিদ্যা),
১০। ড. জিল্লুর রহমান খান (রাষ্ট্র বিজ্ঞান),
১১। জনাব আবদুল মান্নান চৌধুরী (বাণিজ্য),
১২। মিসেস সুলতানা সরওয়াত আরা (মনস্তত্ত্ব),
১৩। জনাব জয়নুল আবদীন (রাষ্ট্র বিজ্ঞান),
১৪। মিসেস রাজিয়া খান আমিন (ইংরেজী),
১৫। ড. ওয়াজিউর রহমান (শিক্ষা ও গবেষণা),
১৬। ড. রওনক জাহান (রাষ্ট্র বিজ্ঞান),
১৭। ড. জহুরুল আনোয়ার (ফলিত পদার্থ বিদ্যা),
১৮। শ্রী জয়কুমার সরোজী (পদার্থ বিদ্যা),
১৯। শ্রী দুর্গাদাস ভট্টাচার্য (বাণিজ্য),
২০। ড. এ টি রফিকুর রহমান (রাষ্ট্র বিজ্ঞান)।
২১। শ্রী রঙ্গলাল সেন (সমাজ বিজ্ঞান) ও আরো অনেকে।

সূত্র: দৈনিক বাংলা, ৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২

Visited 22 times, 1 visit(s) today