২৫শে মার্চ ১৯৭১ || ঢাবির গণহত্যার দৃশ্য জানালা থেকে মুভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে যেভাবে

২৫শে মার্চ ১৯৭১ || ঢাবির গণহত্যার দৃশ্য জানালা থেকে মুভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে যেভাবে
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


যিনি টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন ২৫শে মার্চের হত্যাকাণ্ডের হৃদয়বিদারক দৃশ্য, সেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎকৌশলের অধ্যাপক ড. নূরুল উল্লার সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকার।

প্রশ্ন : আপনি কি ২৫শে মার্চের হত্যাকাণ্ডের ছবি নিজ হাতে তুলেছিলেন?

উত্তর : হ্যাঁ আমি জগন্নাথ হলের মাঠে ২৬শে মার্চের সকাল বেলা যে মর্মস্পর্শী দৃশ্য ঘটেছিলো তার ছবি আমার বাসার জানালা থেকে টেলিস্কোপ ক্যামেরায় তুলেছিলাম।

প্রশ্ন : এ ছবি তোলার জন্য কি আপনার কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিলো, না এমনি হঠাৎ করে মনে হওয়াতে তুলে নিয়েছেন?

উত্তর : ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষণের পর থেকে আমার একটা ধারণা হয়েছিলো যে এবার একটা বিরাট কিছু পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তাই তখন থেকেই বিভিন্ন সভা, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল, মশাল মিছিল, ব্যারিকেড ইত্যাদির ছবি আমি তুলতে আরম্ভ করি।

প্রশ্ন : ক্যামেরাটি কি আপনার নিজস্ব?

উত্তর : না, ওটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ভিডিও টেপ ক্যামেরা। ছাত্রদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনি ধরনের আরো বহু ক্যামেরা ও জটিল যন্ত্রপাতি রয়েছে।

প্রশ্ন : ক্যামেরাটি আপনার কাছে রেখেছিলেন কেন?

উত্তর : এর জবাব দিতে গেলে আমাকে আরো পেছনের ইতিহাস বলতে হয়। ইতিহাস কথাটা বলছি এজন্য যে এগুলো ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা উচিৎ। ৭ই মার্চের পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কিছু ছেলে এসে আমাকে ধরলো, “স্যার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি অয়্যারলেস স্টেশন তৈরী করতে হবে।” আমি ওদের কথা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারলাম না। ৱ

এর পরে ওরা একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কথা ঠিক করে আমাকে তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির একেবারে ভিতরের এক প্রকোষ্ঠে নিয়ে যাওয়ার পরে আমি দেখলাম সেখানে সোফার উপর তিনজন বসে রয়েছেন। মাঝখানে বঙ্গবন্ধু। তাঁর ডানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব এবং বাঁ পাশে তাজউদ্দিন সাহেব।

আমি ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে সালাম করলাম। ছাত্ররা আমাকে বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। যদিও অনেকবার তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি সোফা থেকে উঠে এসে আমাকে ঘরের এক কোণে নিয়ে গেলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত সন্তর্পণে বললেন, “নূরুল উল্লা আমাকে ট্রান্সমিটার তৈরী করে দিতে হবে। আমি যাবার বেলায় শুধু একবার আমার দেশবাসীর কাছে কিছু বলে যেতে চাই। তুমি আমায় কথা দাও, যেভাবেই হোক একটা ট্রান্সমিটার আমার জন্য তৈরী করে রাখবে। আমি শেষবারের ভাষন দিয়ে যাব।”

বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ তখন আমার কাছে বাচ্চা শিশুর আবদারের আবেগময় কণ্ঠের মত মনে হচ্ছিল। এর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমাদের তড়িৎ কৌশল বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকদের কাছে খুলে বললাম। শুরু হল আমাদের কাজ। বিভাগীয় প্রধান ড. জহুরুল হকসহ প্রায় সকল শিক্ষকরাই আমাকে সহযোগীতা করতে লাগলেন। ৯ দিন কাজ করার পর শেষ হলো আমাদের ট্রান্সমিটার। এর ক্ষমতা বা শক্তি ছিল প্রায় সারা বাংলাদেশব্যাপী। শর্ট ওয়েভে এর শব্দ ধরা যেত।

যাহোক পরবর্তী সময়ে এর ব্যাবহার আসেনি। এরই সাথেই আমার মাথায় ধারণা এল, যদি কোন হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ বা গোলাগুলি হয় তাহলে তা আমি ক্যামেরায় তুলে ফেলব। এবং সে থেকেই ক্যামেরাটি আমার সাথে রাখতাম।

প্রশ্ন : আপনি কখন ছবি তোলা শুরু করেন?

উত্তর : রাত্রে ঘুমের মাঝে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে আমাদের সকলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। অবশ্য আমরা অতটা গুরুত্ব দেইনি। আমি ভেবেছিলাম যে আগের মতই হয়ত ছাত্রদেরকে ভয় দেখাবার জন্য ফাঁকা গুলি করা হচ্ছে। অথবা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের নির্দেশ ও সহযোগিতায় যে সমস্ত হাতবোমা তৈরী করছিল তারই দু’একটা হয়ত বিস্ফোরিত হয়েছে। সারাটা রাত একটা আতঙ্কের মধ্যে কাটালাম। জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে জগন্নাথ হলের দিকে তাকাতাম।

কিন্তু সমগ্র এলাকাটা আগে থেকেই বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়াতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। রাতে জগন্নাথ হলের এলাকায় কি হচ্ছিল কিছুই দেখতে পারলাম না। শুধু গোলাগুলির শব্দ শুনছিলাম। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে ওখানে দুপক্ষেই একটা ছোটখাট লড়াই হচ্ছে। সাথে সাথে আমার ক্যামেরাটার কথা মনে পড়ে গেল। অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন সকাল হবে আর দিবালোকে আমি ছবি তুলতে পারবো।

প্রশ্ন : আপনি যে ক্যামেরা বসিয়েছিলেন তা কি বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল না?

উত্তর : এমনভাবে ক্যামেরা বসানো হয়েছিলো যে বাইরে থেকে বোঝার কোন উপায় নেই। কারণ পর্দার আড়ালে এমনভাবে বসানো হয়েছিলো যে শুধু ক্যামেরার মুখ বের করা ছিলো। পুরো ক্যামেরাটা কালো কাপড় দিয়ে মোড়ানো ছিল। আমাদের জানালাগুলো এমনভাবে তৈরী যে বন্ধ করার পরেও ধাক্কা দিলে কিছুটা ফাঁক থেকে যায়। ঐ ফাঁক দিয়ে ক্যামেরার মুখটা বাইরে বের করে রাখলাম।

প্রশ্ন : ক্যামেরা চালু করেন কখন?

উত্তর : সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যবর্তী সময়ে। জানালা দিয়ে লক্ষ্য করলাম যে জগন্নাথ হলের সামনের মাঠে কিছু ছেলেকে ধরে বাইরে আনা হচ্ছে এবং তাদেরকে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে, তখনই আমার সন্দেহ জেগে যায়। এবং আমি ক্যামেরা অন করি। আমাদের ক্যামেরাটির একটা বিশেষ গুণ এই যে, এতে মাইক্রোফোন দিয়ে একই সাথে শব্দ তুলে রাখা যায়। তাই আমি টেপের সাথে মাইক্রোফোন যোগ করিয়ে ক্যামেরা চালু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম যে ছেলেগুলোকে একাধারে গুলি করা হচ্ছে ও একজন একজন করে পড়ে যাচ্ছে।

পাকসেনারা আবার হলের ভিতর চলে গেলো। আমি ভাবলাম আবার বেরিয়ে আসতে হয়ত কিছু সময় লাগবে। তাই এই ফাঁকে আমি টেপটা ঘুরিয়ে আমার টেলিভিশন সেটের সাথে লাগিয়ে ছবি দেখতে লাগলাম যে ঠিকভাবে উঠেছে কিনা। এটা শেষ করতেই আবার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম যে, আবার কিছু সংখ্যক লোককে ধরে নিয়ে এসেছে। আবার লাইন করে দাঁড় করানো হচ্ছে। আমি তখন পূর্বের তোলা টেপটা মুছে ফেলে তার উপর আবার ছবি তোলা শুরু করলাম।

প্রশ্ন : আপনি পূর্বের তোলা ছবিটার টেপ কেন মুছে ফেললেন?

উত্তর : আমার মনে হচ্ছিল আমার আগের ছবিতে সবকিছু ভালোভাবে আসেনি। আর নতুন ছবি তুলতে গিয়ে আমি হয়ত আরো হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য ধরে রাখতে পারব। আর হাতের কাছে আমার টেপ ছিলনা। মোট কথা আমি ঐ সমস্ত দৃশ্য দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেলাম। আজও দুঃখ করি যদি আমি নতুন টেপে ছবি তুলতে পারতাম তাহলে কত ভালো হতো। দুটো দৃশ্য মিলে আমার টেপের দৈর্ঘ্য বেড়ে যেতো। কিন্তু তখন এত কিছু চিন্তা করার সময় ছিলনা।

যা হোক দ্বিতীয়বারের লাইনে দেখলাম একজন বুড়ো দাঁড়িওয়ালা লোক রয়েছে। সে বসে পড়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছে। আমার মনে হচ্ছিলো সে তাঁর দাঁড়ি দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছিল যে সে মুসলমান। কিন্তু বর্বর পাক বাহিনী তাঁর কোন কথাই শুনতে চায়নি। তাকে গুলি করে মারা হলো। মাঠের অপর অর্থাৎ পূর্বপার্শ্বে পাক বাহিনী একটা তাবু বানিয়ে ছাউনি করেছিলো। সেখানে দেখছিলাম, ওরা চেয়ারে বসে কয়েকজন চা খাচ্ছে আর হাসি তামাশা ও আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ছে।

প্রশ্ন : লোকগুলোকে হলের ভিতর থেকে কিভাবে আনা হচ্ছিলো?

উত্তর : যাদেরকে আমার চোখের সামনে মারা হয়েছে ও যাদের মারার ছবি আমার ক্যামেরায় রয়েছে তাদেরকে দিয়ে প্রথমে হলের ভিতর থেকে মৃতদেহ বের করে আনা হচ্ছিল। মৃতদেহগুলি এনে সব এক জায়গায় জমা করা হচ্ছিলো। এবং ওদেরকে দিয়ে লেবারের কাজ করাবার পর আবার ওদেরকেই লাইনে দাঁড় করিয়ে এক সারিতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মনে হচ্ছিলো একটা করে পড়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন : জমা করা মৃতদেহের সংখ্যা দেখে আপনার ধারণায় কতগুলো হবে বলে মনে হয়েছিলো?

উত্তর : আমার মনে হয় প্রায় ৭০/৮০ জনের মৃতদেহ এক জায়গায় জমা করা হয়েছিলো।

প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় যে ওগুলো সবই ছাত্রদের মৃতদেহ?

উত্তর : আমার মনে হয় ছাত্র ছাড়াও হলের মালি, দারোয়ান, বাবুর্চি এদেরকে একই সাথে গুলি করা হয়েছে। তবে অনেক ভালো কাপড়-চোপড় পরা বয়সী দেখে আমার মনে হয় তারা ছাত্রদের গেস্ট হিসাবে হলে থাকছিলো।

প্রশ্ন : আপনি কি দেখেছেন যে কাউকে গুলি না করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে?

উত্তর : না তবে লাইনে দাঁড় করাবার পরে যে খান সেনাটিকে গুলি করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছিলো সে তখন পিছনে তার অফিসারের দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়েছিলো। আর এই ফাঁকে দু’জন লোক সামনে স্তূপ করা মৃতদেহগুলির মধ্যে শুয়ে পড়লো। আর বাকিগুলোকে গুলি করে মারা হলো। গুলি করে যখন খান সেনারা কয়েক ঘণ্টার জন্য এলাকা ছেড়ে চলে গেল সেই ফাঁকে ঐ দু’জন উঠে প্রাণভয়ে পালাতে লাগলো। পরবর্তীকালে তাদের একজন আমার বাসায় এসে আশ্রয় নিয়েছিলো। সে একজন ছাত্রের অতিথি হিসাবে হলে থাকছিলো। ঢাকায় এসেছিলো চাকরির ইন্টারভিউ দিতে।

প্রশ্ন : আপনি কি আপনার ইচ্ছা মতো সব ছবি তুলতে পেরেছিলেন?

উত্তর : না, আমি আগেই বলেছি যে আমি থেমে থেমে তুলছিলাম, পাছে টেপ ফুরিয়ে যায়। তাই আমি সব ছবি তুলতে পারিনি বলে আমারও ভীষণ দুঃখ হচ্ছে। কারণ পরে যখন বুলডোজার দিয়ে সব লাশগুলোকে ঠেলে গর্তে ফেলা হচ্ছিলো সে ছবি আমি তুলতে পারিনি। কারণ ওরা কিছুক্ষণের জন্য চলে যাবার পরপরই আমার পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো।

 

প্রশ্ন : আপনি কি টেপ সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন?

উত্তর : না আমি সাথে নেয়াটা আরো বিপদের ঝুঁকি বলে মনে করে বাসায়ই যত্ন সহকারে রেখে যাই। আর এ ঘটনা আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ জানত না। বাইরে নিয়ে গেলে হয়তো অনেকেই জেনে ফেলতো এবং আজকে এই মূল্যবান দলিল আমি দেশবাসীর সামনে পেশ করতে পারতাম না।

প্রশ্ন : আপনি কখন এই টেপ সবার সামনে প্রকাশ করলেন?

উত্তর : যুদ্ধ চলাকালীন নয় মাস প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত আমার আতঙ্কের মধ্যে কেটেছে। কখন কে জেনে ফেলে। কখন আমি ধরা পড়ে যাই বা কখন এটা এসে নিয়ে যায়। এমনি মানসিক যন্ত্রণায় আমি ভুগছিলাম। যাহোক দেশ স্বাধীন হবার পরে ১৭ই ডিসেম্বর-এর দিকে আমি আস্তে আস্তে প্রকাশ করলাম আমার এই গোপন দলিলের কথা এবং ২/৩ দিন পরেই এটা আমি সবাইকে জানালাম ও কয়েকদিন পরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও অন্যান্যদের এটা দেখালাম। এ খবর শুনে অনেক বিদেশী সাংবাদিক আমার কাছে বহু টাকার বিনিময়ে এই দলিলের অরজিনাল কপি অর্থাৎ আসল টেপ চাইলেন।

প্রশ্ন : আপনি কি রাজি হলেন?

উত্তর : আমার রাজি হবার প্রশ্ন ওঠে না। অরিজিনাল কপি আমি হারালে আমার দেশের জন্য বিরাট ক্ষতি হবে।

Visited 55 times, 1 visit(s) today