ইআবার তিন পীর সহোদরের শোচনীয় ভরাডুবি: তুমুল প্রভাব সত্ত্বেও পাত্তা পাননি নিজ এলাকায়

ইআবার তিন পীর সহোদরের শোচনীয় ভরাডুবি: তুমুল প্রভাব সত্ত্বেও পাত্তা পাননি নিজ এলাকায়
শেয়ার করুন
❐ নিজস্ব সংবাদদাতা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (ইআবা)। বৃহত্তর বরিশালসহ সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি দলটির। কর্মী-সমর্থকের নেই অভাব। ২০২৪-এর জুলাই দাঙ্গায় ছিল সরব উপস্থিতি। দেশজুড়ে বিভিন্ন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই অন্যান্য উগ্রবাদী দলগুলোর সাথে মিলে তাণ্ডব ও সহিংসতায় ছিল না পিছিয়ে। জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেছে দলটি বহুবার। সন্তোষজনক ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী অনিয়মের ওপর দায় চাপানো হয়েছে বারবার।

অথচ এবারের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর পর ব্যাপক তোড়জোড় নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পদচারণা শোনা গেছে দলটির শীর্ষ নেতাদের। দুদিন পর পর প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সাথে যমুনায় বৈঠক, কখনো বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে নিয়ে সেনাপ্রধানের সাথে বৈঠক, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের সাথে সামনের সারিতেও দেখা গেছে তাদের।

ইআবার প্রধান নেতা চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম নিজে নিজে নির্বাচনে প্রার্থী না হয়েও মাঠে উপস্থিতি ছিল সর্বব্যাপী। মঞ্চ, মিছিল কিংবা গণসংযোগ—সবখানেই শোনা গেছে তার কণ্ঠ। দেশের নানা প্রান্তে তিনি ছিলেন সক্রিয়, আর প্রতিদিনই গণমাধ্যমে আলোচনায়। তার দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ২৫৩ জন প্রার্থী দেয়। হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীদের প্রতি কর্মীদের প্রত্যাশা ছিল চোখে পড়ার মতো।

জুলাই দাঙ্গার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর পর ফাঁকা মাঠে এ নির্বাচনে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে, এমন আশা করছিল দলটি। কিন্তু সেই আশা গুড়ে বালি।

বরগুনা-১ আসনে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী অলি উল্লাহর জয় ছাড়া দলটির বড় বড় নেতাদের সবারই হয়েছে ভরাডুবি। চরমোনাই পীর পরিবারের নির্বাচনী বাস্তবতা এটাই। পীরের তিন ভাই চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও কেউ জয় পাননি। একজনের তো জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। পাত্তা পাননি নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকাতেই।

পীরালি ব্যবসা আর রাজনীতি: এলাকায় প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-ইআবার রাজনীতি করা চরমোনাই পরিবার এলাকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী। রাজনীতিকে হাতিয়ার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের ইতিহাস তাদের অনেক পুরনো। ধর্মীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয় সরকার—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারের প্রভাব বিদ্যমান। ধর্মভিত্তিক কারবারের মাধ্যমে নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

চরমোনাই তরিকায় দেশব্যাপী মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে। আকিদাগত পার্থক্য এবং নির্দিষ্ট ঘরানায় শিক্ষাদান নিয়ে অপর ধারাগুলোর সাথেও তাদের সংঘাত অনেক পুরনো। এই ধর্ম ব্যবসা এবং প্রভাব বিস্তারের জেরে অতীতেও বহুবার বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মাঝে বিবাদ দেখা গেছে।

চরমোনাই পীর নিজে ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে চরমোনাই ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে সেই দায়িত্ব পালন করেন তার ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের, যিনি দু’বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে চেয়ারম্যান পীরের আরেক ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ জিয়াউল করিম।

পরিবারের চার ভাই—সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের, সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম, সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী ও সৈয়দ মুহাম্মদ নুরুল করিম—বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেলেও কেউ সংসদে পৌঁছাতে পারেননি। তাদের দৌড় ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্তই ছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাত্তা মেলেনি। জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

যোগ্যতা অনুসারে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সামর্থ নেই বলে মনে করেছেন ভোটাররা, এমন চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে।

ইআবা প্রার্থী আর চরমোনাইদের সংসদ নির্বাচনের দৌড় কতটা?

বরিশাল-৪ (হিজলা–মেহেন্দীগঞ্জ–কাজিরহাট) আসনে প্রার্থী ছিলেন সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের। তিনি ইআবার সহকারী মহাসচিব ও বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান।

প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী তিনি পেয়েছেন ৩৬,৭৫৩ ভোট। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান পেয়েছেন ১,২৮,৩২২ ভোট এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪,৬৮৪ ভোট। ফলে এখানে চরমোনাই পরিবারের প্রার্থী স্পষ্টতই তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন।

ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবুল খায়ের লেখেন, ‘ভোটের ফল প্রত্যাশা অনুযায়ী আসেনি। তবু এটি ব্যর্থতা নয়। আমাদের পরিশ্রম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য—তাই বৃথা যায়নি। ধৈর্য ধরে একসঙ্গে থাকব, আরও শক্ত হয়ে ফিরে আসব, ইনশাআল্লাহ।’

বরিশাল-৫ (বরিশাল সিটি–সদর) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে প্রার্থী ছিলেন ইআবার সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম। বরিশাল-৫ আসনে তিনি পেয়েছেন ৯৩,৫২৮ ভোট। তবে ১,৩১,৪৩১ ভোট পেয়ে আসনটি জিতে নেন বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।

বরিশাল-৬ আসনে তার অবস্থান আরও দুর্বল ছিল। এখানে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮১,০৮৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মো. মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৪,৫৩৩ ভোট। আর হাতপাখা প্রতীকের চরমোনাই পীর ফয়জুল করিমের প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র ২৮,৮২৩।

ভোটের ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নিজের প্রাপ্ত ভোট উল্লেখ করে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

ঢাকা-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ, যিনি আল মাদানী নামে পরিচিত। তিনি ইআবার প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চরমোনাই আহছানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ। এই আসনে মোট ভোট পড়ে ৪৫ শতাংশ। জামায়াত প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জয়ী হন। হাতপাখা প্রতীকে মোসাদ্দেক বিল্লাহ পেয়েছেন মাত্র ৬,৫১৮ ভোট—ফলে জামানতও রক্ষা হয়নি।

পীরালি ব্যবসার দাপট রাজনীতিতে ফেলতে পারেনি প্রভাব

ইআবার রাজনীতিতে চরমোনাই পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রচুর। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি—সর্বত্রই তাদের উপস্থিতি। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম, ওয়াজ মাহফিল ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে সামাজিক দাপট তৈরি হলেও সংসদীয় রাজনীতির বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে অনুসারী থাকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় ভোটব্যাংক। প্রয়োজন রাজনৈতিক আদর্শ। জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার মত যোগ্যতাও প্রয়োজন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সংগঠন সুজনের সম্পাদক রফিকুল আলমের মতে, চরমোনাই দরবারের প্রভাব প্রশ্নাতীত হলেও সংসদীয় নির্বাচনে ভিন্ন সমীকরণ কাজ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইআবার ভোটব্যাংক সীমিত। দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দল- আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াতের মাঝে স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকতে হলে তাদের পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। তরুণ ও শহুরে ভোটারদের সঙ্গে চরমোনাইদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি দেশের মানুষ যে বীতশ্রদ্ধ এবং তাদের প্রতি অনাগ্রহী, এটা আবারও স্পষ্ট হয়েছে চরমোনাইদের ভরাডুবির মাধ্যমে।

Visited 13 times, 1 visit(s) today