❐ বিশেষ প্রতিবেদক
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় কঠোর আইনশৃঙ্খলা দিয়ে সারা দেশে বার্তা দিতে চায় সরকার—এমনটাই দাবি করছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা রাজনৈতিক অরাজকতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না—এই বার্তা পৌঁছে দিতে ঢাকাকে ‘রোল মডেল’ হিসেবে দাঁড় করানোর পরিকল্পনার কথাও বলা হচ্ছে বারবার।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। মুখে কঠোরতার বুলি, ভেতরে ভয়, দ্বিধা আর সক্ষমতার সংকট—এই দ্বন্দ্বেই দাঁড়িয়ে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকায় সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীতেই সামান্য মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি কিংবা হঠাৎ জমায়েত সামাল দিতে গিয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে দেখা যাচ্ছে।
ঢাকায় এই অবস্থার পাশাপাশি জেলা ও মফস্বল শহরগুলোর পরিস্থিতিও নড়বড়ে।
বিভিন্ন জেলা শহরে দায়িত্বে থাকা একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত। বড় আকারের সহিংসতা বা সংঘর্ষ শুরু হলে তা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করার মতো জনবল, মনোবল কিংবা কার্যকর প্রস্তুতি পুলিশের নেই বললেই চলে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন করে তুলেছে আরেকটি বাস্তবতা—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের ভয়-ভীতি আর কাজ করছে না।
একসময় পুলিশের উপস্থিতিই যেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ছিল, এখন সেখানে হুমকি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশ একশানে না গেলে বলে—পুলিশ কোনো কাজের না। আবার একশানে গেলে বলে—এই পুলিশ ৫ই আগস্টের পুলিশ। একশানে গেলেই ৫ই আগস্টের কথা বলে হুমকি দেওয়া হয়—আবার পুলিশকে ঝুলিয়ে রাখা হবে, আগুন দেওয়া হবে। তাহলে পুলিশ করবে কী?”
সরকার বলছে, নির্বাচনকালীন সময়ে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, সেনাবাহিনী, র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীও মাঠে থাকবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।
একদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অন্যদিকে বাহিনীগুলোর ওপর রাজনৈতিক বিতর্ক ও আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে বাহিনী নামালেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীতে ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি, অতীতে সংঘর্ষপ্রবণ এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করে বিশেষ পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।কিন্তু এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থার দায় শুধু মাঠপর্যায়ের পুলিশের ঘাড়ে চাপিয়ে দায় সারা যাবে না। ইউনুস সরকারের উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য আর কঠোরতার ঘোষণার আড়ালে বাস্তব প্রস্তুতির ঘাটতি দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনও যেন দায়িত্ব এড়িয়ে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভর করে নির্বাচন ‘ম্যানেজ’ করার পথে হাঁটছে। মাঠের বাস্তবতা, বাহিনীর সক্ষমতা ওজনমনের মনস্তত্ত্ব—এসব বিবেচনায় না নিয়ে নেওয়া কাগুজে সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
