বিশেষ প্রতিবেদক
সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রার্থীরা দিন-রাত অবিরাম প্রচারে ব্যস্ত। তবে নির্বাচন মানেই কেবল আশ্বাস আর সুমধুর কথায় ভোটারদের মন জয় নয়—এখানে বড় ভূমিকা রাখে অর্থ।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই টাকার প্রবাহ চোখে পড়ার মতো বেড়ে যাচ্ছে। এসব অর্থের উৎস যেমন স্পষ্ট নয়, তেমনি প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণও অজানা থেকে যাচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয়ের অনুমতি রয়েছে।
ভোটারসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় সংসদীয় আসন গাজীপুর-২। এখানে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। সে হিসাবে এই আসনে প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ৮০ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
অন্যদিকে, ৩০০ আসনের মধ্যে সর্বনিম্ন ভোটারসংখ্যার আসন ঝালকাঠি-১, যেখানে ভোটার রয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। ফলে সেখানে একজন প্রার্থীর ব্যয়সীমা সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এই আসনে ভোটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় ২২ টাকা ৮৪ পয়সা।
ভোটারসংখ্যায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন ঢাকা-১৯, যেখানে ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন ভোটার রয়েছেন। সেখানে প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ৭৪ লাখ ৭০ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন।
আগের নির্বাচনগুলোতে ভোটারপ্রতি ব্যয় ১০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও মোট ব্যয় ২৫ লাখ টাকার বেশি করার সুযোগ ছিল না। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই সীমাবদ্ধতা শিথিল করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অথবা ভোটারপ্রতি ১০ টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি হবে, সেটি পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন।
নির্বাচনী ব্যয় প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আরপিওর অনুচ্ছেদ-৪৪ অনুযায়ী ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয়ের বিধান রয়েছে। তবে দেশের সার্বিক নির্বাচনী প্রচারের ধরন পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই অনুমান করা যায়, এই সীমা কার্যত মানা হচ্ছে না।
নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এমনকি কালো টাকার ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগের বাস্তবতা মিলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে। নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাসে ব্যাংক থেকে মানুষের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানান, গত দুই মাসে নগদ টাকা উত্তোলনের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, নির্বাচনী ব্যয় মেটাতেই প্রার্থীরা ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা তুলছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে থাকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছিল।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশন কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে।
গত ১১ই জানুয়ারি থেকে নগদ অর্থ জমা ও উত্তোলনের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে বিএফআইইউ। নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো হিসাবে এক দিনে বা একাধিক লেনদেনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হলে বাধ্যতামূলকভাবে সিটিআর (ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্ট) দাখিল করতে হবে।
এই প্রতিবেদন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সঠিক প্রতিবেদন জমা না দিলে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায়ও সাময়িক সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ এমএফএস সেবার মাধ্যমে দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করা যাবে, যেখানে প্রতিটি লেনদেনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা।
একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির হিসাবে টাকা স্থানান্তর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। এই বিধিনিষেধ ৮ থেকে ১৩ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
জানা গেছে, ভোটারদের প্রভাবিত করতে যাতে অর্থের অপব্যবহার না হয়, সে লক্ষ্যেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে বিএফআইইউ এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ কালো টাকার অবাধ ব্যবহার কিছুটা কমাতে সহায়ক হলেও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। যারা রাজনীতিকে ব্যবসা হিসেবে দেখেন, তারা যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে জয়ী হতে কালো টাকা ব্যবহার করতেই থাকবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনেকেই জনসেবার মানসিকতা নিয়ে নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যেই নির্বাচনে অংশ নেন।
এ ধরনের ব্যক্তিরাই রাজনীতিকে কলুষিত করে তুলছেন। নির্বাচনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে ক্ষমতায় গিয়ে সেই অর্থ সুদে-আসলে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই দুষ্টচক্র বন্ধ না হলে দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি কিংবা কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তাই নির্বাচনে কালো টাকার বিরুদ্ধে ভোটারদের সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।
