নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের কটূক্তিমূলক ও নারীবিদ্বেষী বক্তব্য নতুন নয়। অতীত থেকে বর্তমান—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নারী শিক্ষার্থীদের ঘিরে অবমাননাকর মন্তব্যের ধারাবাহিকতায় আবারও আলোচনায় এসেছে দলটির আদর্শিক অবস্থান।
প্রয়াত জামায়াত নেতা সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে প্রকাশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বেশ্যাবিদ্যালয়’ বলে উল্লেখ করতেন। এসব বক্তব্যের ভিডিও ও অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো প্রচলিত রয়েছে। একই সঙ্গে ইডেন কলেজসহ বিভিন্ন নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও তাঁর বক্তব্য ছিল চরম কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর।
সাম্প্রতিক সময়ে সেই পুরনো বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে। কর্মজীবী নারীদের ‘বেশ্যা’ বলার অভিযোগ ওঠার পর ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝাড়ু মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন নারী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী ও নারী অধিকারকর্মীরা। রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হওয়া ওই মিছিলে উচ্চারিত হয়— “কেমন হ্যাকার করলো হ্যাক, বেশ্যা ডেকেই আইডি ব্যাক”—এই স্লোগান।
বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, জামায়াত আমিরের বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দলটির দীর্ঘদিনের নারীবিরোধী রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। তাদের ভাষ্য, নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে ‘নৈতিক অবক্ষয়’ বা ‘ব্যভিচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা নারীর মর্যাদা, সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
এই বিতর্কের পেছনে আরও শক্ত প্রেক্ষাপট তৈরি করে আল জাজিরাকে দেওয়া জামায়াত আমিরের একটি সাক্ষাৎকার। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর কাঠামোয় নারীরা কখনো আমির বা শীর্ষ নেতৃত্বে যেতে পারবেন না। তাঁর যুক্তি ছিল—আল্লাহ পুরুষ ও নারীকে ভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছেন; নারীদের প্রধান দায়িত্ব সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন, যা নেতৃত্বের মতো দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর মধ্যেই জামায়াত আমিরের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি পোস্ট নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয়। ওই পোস্টে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে সরাসরি ‘আরেক ধরনের prostitution’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং সেটি জামায়াতের নির্বাচনী হ্যাশট্যাগসহ প্রচার করা হয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে পোস্টটি মুছে ফেলে ‘অ্যাকাউন্ট হ্যাকড’ হওয়ার দাবি করা হয়।
তবে এই ‘হ্যাকড’ হওয়ার দাবি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ, অ্যাকাউন্টটি এর আগে ও পরে স্বাভাবিকভাবেই সক্রিয় ছিল এবং বিতর্কিত পোস্টের বক্তব্য আল জাজিরা সাক্ষাৎকারে দেওয়া অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর আগেও দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমে জামায়াত নেতাদের নারীবিরোধী বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ডাকসু, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নারী, নারী সংস্কার কমিশনের সদস্য কিংবা কর্মজীবী নারীদের ‘বেশ্যা’ বলা জামায়াত ও তাদের সহযোগী সংগঠনের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বরগুনায় জামায়াত নেতার ডাকসুকে ‘বেশ্যাখানা’ বলার অভিযোগও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করছেন তারা।
এই প্রেক্ষাপটে অতীতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজে দেওয়া বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও নারীদের নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার জামায়াতের আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গেই যুক্ত, যা সময়ের সঙ্গে বদলায়নি।
ঝাড়ু মিছিল শেষে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানান, নারীর মর্যাদা ও সমান অধিকারের প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবেন না। জামায়াতে ইসলামীর নারীবিরোধী রাজনীতির বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ আরও জোরদার করার ঘোষণাও দেন তারা।
