অতীত খুঁড়ি; খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি!

অতীত খুঁড়ি; খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি!
শেয়ার করুন

-আহমেদ ইশতিয়াক

মসজিদের বাকি সবগুলো পিলারই সাদা, শুধু এই পিলারটিই কালো।
.
কিন্তু এই পিলারটি কালো কেন?
কারণ এই পিলারটির নিচেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর এক বধ্যভূমি। মসজিদটির নাম আগে ছিলও নূরী মসজিদ।
.
বর্তমানে এটি শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটির অবস্থান মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের মুসলিম বাজারে। এই মসজিদটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধকালে বিহারী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকেন্দ্র।
.
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ২৭ জুলাই এই মসজিদটি সম্প্রসারনের সময়ই উদঘাটিত হয় এক ভয়াল অধ্যায়ের। কালো রঙের এই পিলারটি যেখানে, সেখানে ছিলো একটি বদ্ধ জমাট বাধা কুয়া। যে কুয়া ঢাকা পড়েছিলো বহুদিনের কালের ধুলায়।

মসজিদের নির্মাণ কাজে মাটি খননের সময় ঐ কুয়ো আবিষ্কৃত হয়েছিল তখন। আর সেই কুয়ার খুঁড়তেই বেরিয়ে এলো অসংখ্য মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড়। তৎক্ষণাৎ চারদিকে খবর পৌঁছে গেল।

এরপর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এগিয়ে এলো। সেনাবাহিনীর সহযোগিতাও পাওয়া গেল। শুরু হলো কুয়া সহ তৎসংলগ্ন জায়গা খনন। কেবল ঐ কুয়াতেই পাওয়া গিয়েছিল ৬০০র বেশী খণ্ড ও অখণ্ড মানুষের হাড়।
.
মুসলিম বাজার বধ্যভূমি বা নুরী মসজিদ ছিল মিরপুরের মাত্র একটি বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধে যে কতোটা আত্মত্যাগের তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিলো মিরপুর। মিরপুরে এমন জায়গা অহরহ পাওয়া গিয়েছিলো।
.
মুক্তিযুদ্ধে ঢাকায় যে ৭৬টি স্বীকৃত বধ্যভূমি ছিলো তার ২৭টি বধ্যভূমির অবস্থানই মিরপুরে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরেও দেড় মাস অবরুদ্ধ থাকার পর ১৯৭২ সালের আজকের দিন তথা ৩১ জানুয়ারি মুক্ত হয় মিরপুর।
.
মুক্তিযুদ্ধে মিরপুর যেন ছিল এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা অখণ্ড জনপদ । মিরপুর যেন এক জলজ্যান্ত কসাইখানা। গণহত্যার জন্য মিরপুর ছিল এক আদর্শ স্থান। এর অন্যতম প্রধান কারন মিরপুর ছিল অনেকটা বিরান জনপদ, চতুর্দিকে জলাভূমি, এবং অপেক্ষাকৃত অনেকাংশে নিচু এলাকা এবং নিভৃত পল্লী।
.
মিরপুর মুক্ত হওয়ার পরে ৩১ জানুয়ারি মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনের ডি ব্লক ঈদগাহ মাঠে পাকিস্তানিরা যে অস্ত্রসমর্পণ করেছিল সেই জমাকৃত অস্ত্রে পরিমাণই ছিল ৩০ ট্রাক।
.
ধারণা করা হয় মুক্তিযুদ্ধে মিরপুরে কমপক্ষে ৫০ হাজারেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি, বিহারী ও রাজাকার, আলবদরেরা।
.
মুক্তিযুদ্ধে মিরপুর তো বটেই সমগ্র বাংলাদেশেরই নৃশংসতার বড় উদাহরণগুলোর একটি ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি। একাত্তরে এই জায়গার একপাশ ছিল ঘন জঙ্গল। এই জঙ্গলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করে হানাদার ও তাদের দোসররা। খোরাক করা হয়েছে শিয়াল কুকুরের। . মুক্তিযুদ্ধে সন্ধান পাওয়া সবগুলো বধ্যভূমির মধ্যে শিয়ালবাড়িতেই সবচেয়ে বেশী লাশের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। পুরো মুক্তিযুদ্ধে শিয়ালবাড়ি পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে।
.
বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ভবন থেকে কমার্স কলেজ যেতে যে কালভার্টটি পড়ে সেখানেই পাওয়া গিয়েছিল ৬০ বস্তা মাথার খুলি। শিয়ালবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের আগে বাসিন্দা ছিল আড়াই হাজারের মতো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে তা একপ্রকার বিরান জনপদে পরিণত হয়।
.
মিরপুরে কালাপানি বধ্যভূমির পূর্ব নাম ছিল কালসিগ্রাম। ১৯৬৪ সাল থেকে বিহারীরা এই গ্রামে আবাস গড়ে তুলেছিল। কালাপানি মূলত নিচু ও নির্জন হওয়ায় বিহারী অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যা করে ফেলে গিয়েছিল এখানে। স্বাধীনতার পর কেবল ৮১ বস্তা হাড়গোড় উদ্ধার করা গিয়েছিল কালাপানি থেকে। এছাড়া পাওয়া গিয়েছিল সর্বমোট ১৯১টি লাশ।
.
বেশীরভাগ মানুষকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল কালাপানি বধ্যভূমিতে। কালাপানি গণহত্যায় সবচেয়ে বেশী ভূমিকা পাওয়া যায় তৎকালীন জামায়াত নেতা এ জি খানের। তার সঙ্গে ছিল মিরপুরের কসাই খ্যাত আখতার গুন্ডা, মাস্তানা এবং সফু গুন্ডা। এরা সবাই ছিল বিহারী নেতা।
.
কালাপানি গণহত্যার আরেক নির্মম সাক্ষী ছিল হাজীদের বহনকারী বিআরটিসির লাল মাইক্রোবাসগুলো। যেগুলোতে করে মূলত হাজীদের বহন করা হতো। মুক্তিযুদ্ধে এই বিআরটিসির লাল মাইক্রোবাসগুলো ব্যবহারিত হতো টেকনিক্যাল ও শহরের নানা প্রান্ত থেকে নির্যাতিত মানুষদের এখানে এনে হত্যা করার জন্য।
.
কালাপানি গণহত্যাতেই সর্বশেষ দিনে শহীদ হয়েছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হান এবং মিরপুরের অ্যাডিশনাল এসপি জিয়াউল হক লোদী সহ অর্ধশত পুলিশ এবং সেনা সদস্য।
.
মিরপুরের অন্যতম বধ্যভূমি ছিল শিরনিরটেক বধ্যভূমি। শিরনিরটেক তুরাগ নদীর তীরবর্তী এলাকা। মুক্তিযুদ্ধে কাউন্দিয়া, দিয়াবাড়ি, বাঘসাত্রা, চান্দারটেক গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষকে তুলে এনে হত্যা করা হয়েছিল শিরনিরটেকে। শিরনিরটেকে গণহত্যার সবচেয়ে বড় কারন ছিল পাশেই তুরাগ নদী থাকায় লাশ ভেসে যেত নদীতে। মিরপুরের বধ্যভূমির গুলোর মধ্যে শিরনিরটেকে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল রাজাকার এবং পাকিস্তানি সেনারা। আলী হোসেন রাজাকার, ফয়েজ রাজাকার, আইলা গুণ্ডার নেতৃত্বেই চালানো হয়েছিল এই গণহত্যা।
.
মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের শাহ আলী মাজারের উত্তরে মনির উদ্দিন শাহ’র মাজার সংলগ্ন সারেং বাড়ি বধ্যভূমি ছিল মুক্তিযুদ্ধে চরম পৈশাচিকতার সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধে সারেং বাড়ির দুটি কুয়া ও একটি সুয়ারেজ রিজার্ভার ভর্তি ছিল মানুষের লাশে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সারেং বাড়ি ছিল অনেকটাই নির্জন এবং গাছপালায় পূর্ণ। মূলত সে কারনেই এই স্থানকে গণহত্যার জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচ্য করা হয়েছিল। বিহারীরা এখানে বাঙালিদের ধরে এনে গাছে ঝুলিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো। এরপর কুপিয়ে হত্যা করতো। ১৯৯২ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন সুয়ারেজ পরিষ্কার করতে গেলে সুয়ারেজ এবং কুয়া থেকে বেরিয়ে আসে অজস্র মানুষের হাড়গোড়, খুলি ও নানান ব্যবহার্য সামগ্রী।
.
মুক্তিযুদ্ধে মিরপুরের গণহত্যার অন্যতম সাক্ষী ছিল গোলারটেক বধ্যভূমি। বর্তমানে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের পিছনের জায়গাটিই গোলারটেক। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের একাংশ জুড়েও ছিল বধ্যভূমি। এছাড়া স্মৃতিসৌধের উত্তর দিকে গণকবরটিই আজ একমাত্র সাক্ষী এই বধ্যভূমির। এই গণকবরে কবর দেয়া হয়েছিল ১৮ জনকে। মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন গোলারটেক ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন পরিত্যক্ত কুয়ায় পাওয়া গিয়েছিল শত শত খণ্ড, অখণ্ড হাড়গোড়। পুরো কুয়াই ছিল লাশে পরিপূর্ণ। গোলারটেক ঈদগাহ মাঠের দক্ষিণ পাশে ছিল একটি ডোবা। এই ডোবা ছিল লাশে পরিপূর্ণ। গোলারটেক ১ম, ২য় এবং ৩য় কলোনি জুড়ে ছিল বিহারী কলোনি। যদিও এই এলাকা ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ তৈরির সময়েও পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য নর কঙ্কাল ও মাথার খুলি।
.
মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুর বাংলা কলেজ ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেল। মিরপুর বাংলা কলেজের টিচার্স কমনরুমের দক্ষিণে ছিল দুটি কুয়া। বর্তমানে এই কুয়া দুটি বিলীন হয়ে গেছে। এই দুটি কুয়া ভর্তি পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য লাশ। কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবনের সামনে পাওয়া গিয়েছিল আরেকটি কুয়া। এই কুয়া ভর্তিও পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য মানুষের লাশ। এছাড়া অধ্যক্ষের কলেজের বাসভবনের পিছনের আম বাগানে পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য মানুষের লাশ। কলেজ ছাত্রাবাসের পিছনে থাকা নিচু জায়গায় এনে হত্যা করা হয়েছিল অসংখ্য মানুষকে। পরে তাদের লাশ ফেলে দেয়া হয়েছিল কলেজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন দুটি কুয়াতে।
.
ঢাকা সেনানিবাসের পাশে মিরপুরের আলোকদী। মুক্তিযুদ্ধে বর্বরতা ও নৃশংসতার সবচেয়ে বড় সাক্ষীগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিরপুরের আলোকদী গ্রাম এবং আলোকদী বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা বিহারী ও রাজাকারদের সহযোগিতায় ঘিরে ফেলেছিল পুরো আলোকদী গ্রাম। গ্রামকে ধসিয়ে দিতে ব্যবহার করা হয়েছিল কামানের গোলা অব্দি। ২৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২৫ এপ্রিল দুপুর একটা পর্যন্ত চলেছিল পৈশাচিক গণহত্যা। এই গ্রামের আটটি কুয়া পূর্ণ ছিল মানুষের লাশে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী জলাশয়ের ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিলো নিরীহ গ্রামবাসীকে। এই গ্রামে শহীদের সংখ্যা ২৫০০ থেকে ৩ হাজারের মতো।
.
মুক্তিযুদ্ধে মিরপুরের পাম্প হাউজ বা জল্লাদখানা বধ্যভূমি ছিল অন্যতম। সেখানে নিরীহ সাধারণ মানুষকে কুপিয়ে আর জবাই করে সুয়ারেজে ফেলা হয়েছিলো।
.
এই বধ্যভূমিতে মূলত হত্যা করা হতো মিরপুর ১০, ১১ এবং ১৩ নম্বর সেকশনের নিরীহ মানুষদের। জল্লাদখানা বধ্যভূমি মূলত একটি সুয়ারেজ রিজার্ভার। নিরীহ মানুষদের জবাই করে হত্যার পর খণ্ড বিখন্ড করে সুয়ারেজ রিজার্ভারের মুখ দিয়ে ফেলে দেয়া হতো।
.
এই বধ্যভূমিতে পরবর্তীতে খননকাজ চালিয়ে পাওয়া গিয়েছিল ৭০টি মাথার খুলি, ৫৩৯২টি অস্থিখণ্ড, শাড়ি, ফ্রক, ওড়না, অলংকার, জুতা, তসবিসহ শহীদদের ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র।
.
স্বাধীন মিরপুর যে কতোটা আত্মত্যাগের ফসল তা অবর্ণনীয়। মিরপুর মুক্ত দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি যেসব অজানা শহীদদের প্রতি। যাদের রক্তের বিনিময়ে নির্মিত হয়েছিল স্বাধীন মিরপুর।

Visited 3 times, 1 visit(s) today