নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্য এবং তার পরবর্তী ‘হ্যাকড অ্যাকাউন্ট’ দাবি দেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, জামায়াতে নারীরা কখনো আমির (প্রধান) হতে পারবেন না। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, আল্লাহ পুরুষ ও নারীকে ভিন্নভাবে সৃষ্টি করেছেন—নারীরা সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের দায়িত্বে থাকেন, যা নেতৃত্বের মতো দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি, যা তার বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু এই মন্তব্যের পর যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়, তখন জামায়াতের আমিরের ভেরিফাইড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে:“On the question of women, Jamaat’s position is neither confused nor apologetic—it is principled. We do not think women should come in the leadership. In Jamaat, it is impossible. Allah did not permit this. We believe that when women are pushed out of the home in the name of modernity, they are exposed to exploitation, moral decay, and insecurity. It’s nothing but another form of prostitution…”
এই পোস্টে নারীদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়াকে ‘আরেক ধরনের ব্যভিচার’ (prostitution) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা নারী অধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করে। পোস্টটিতে #BuildingBangladeshTogether এবং #Jamaat2026 হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে, যা দলের নির্বাচনী প্রচারের অংশ বলে মনে হয়।
মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই যখন বিদ্রূপ, সমালোচনা ও ছবি শেয়ারের ঝড় ওঠে, তখন একই অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি ডিলিট করে একটি ডিসক্লেইমার দেওয়া হয়:“Important Announcement: We wish to clarify that the account of the Ameer-e-Jamaat was recently hacked and content was posted that was falsely attributed to him. Necessary steps have been taken… Campaign Team”
এই ‘হ্যাকিং’ দাবিকে অনেকে সুস্পষ্ট মিথ্যা ও প্রতারণা বলে মনে করছেন। কারণ, অ্যাকাউন্টটি এর আগে-পরে স্বাভাবিক পোস্ট করতে থাকে, এবং এ ধরনের বক্তব্য জামায়াতের দীর্ঘদিনের আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে আমির নিজেই অনুরূপ কথা বলেছেন, যা দেশীয় গণমাধ্যমে (যেমন TBS News, The Daily Star, Prothom Alo) প্রকাশিত হয়েছে।
এ ঘটনা জামায়াতের নারীবিদ্বেষী মনোভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। দলটি প্রকাশ্যে নারীদের ‘সম্মান ও নিরাপত্তা’র কথা বললেও, বাস্তবে নারীদের নেতৃত্ব, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং স্বাধীনতাকে ‘নৈতিক পতন’ হিসেবে দেখে। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তালেবানি মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়, যা বাংলাদেশের সংবিধানের সমতা ও নারী অধিকারের পরিপন্থী।
আরও গুরুতর বিষয় হলো, জামায়াতের লুকায়িত মনোভাব ইসলামী শাসনব্যবস্থা (খিলাফতভিত্তিক) প্রতিষ্ঠার, যা মাঝে মাঝে বিভিন্ন কর্মকান্ডে প্রকাশিত হয়েছে এর আগেও, কিন্তু জামাত সেটা বারে বারে অস্বীকার করে আসছে। জামাতের নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন নারী বিরোধী মন্তব্যে, ডাকসুর ছাত্রীদের বেশ্যা বলা, ছাত্রদের মাদক ব্যাবসায়ী বলা, বা নারী সংস্কার কমিশনের সদস্যাদের বেশ্যা বলার সাম্প্রতিক উদাহারন গুলো বিবেচনা করলে এটা আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, “শ’রিয়া আইন”ই জামাতের গোপন এজেন্ডা। এই আদর্শে নারীদের অবস্থান সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত থাকবে, যা বাংলাদেশের সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ ঘটনা বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে: একটি দল যদি নারীদের নেতৃত্বকে ‘অসম্ভব’ মনে করে এবং তাদের কর্মক্ষেত্রকে ‘ব্যভিচার’ বলে, তাহলে তারা কীভাবে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে? জামায়াতের এই অবস্থান শুধু নারী অধিকারের জন্য নয়, গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের জন্যও হুমকি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই ঘটনা জনগণকে দলটির প্রকৃত এজেন্ডা বুঝতে সাহায্য করছে।


