- ক্ষমতা ছাড়ার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিতের তৎপরতা
- নির্বাচনের পরিবর্তে অনিশ্চয়তা তৈরির চেষ্টা
- গণভোটকে কেন্দ্র করে চাপে বিএনপি
- জুলাই চেতনার নামে প্রভাব বিস্তার
বিশেষ প্রতিবেদক
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে একটি সংগঠিত অংশ পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বানচালের পথে এগোচ্ছে—এমন তথ্য মিলেছে একাধিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্রে। এই অংশটির প্রধান লক্ষ্য নির্বাচনের আগে ও পরপরই নিজেদের জন্য সেফ এক্সিট নিশ্চিত করা অথবা জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান নিশ্চিত করা। এই দুই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়াই তাদের বিকল্প কৌশল।
সূত্রগুলো জানায়, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ, প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ প্রশাসনের প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সরকারে থেকে জামায়াতের বিভিন্ন কৌশলগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে। নির্বাচন সামনে আসতেই এই গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি জবাবদিহি কার্যকর করা সম্ভব না হয়।
সূত্র জানায়, এই গোষ্ঠীর প্রধান আশঙ্কা বিএনপির সম্ভাব্য ক্ষমতায়ন। বিএনপি ক্ষমতায় এলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু হতে পারে। সেই ঝুঁকি এড়াতেই এখন থেকেই সেফ এক্সিটের পরিকল্পনা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ভিন্ন খাতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশে নিয়ন্ত্রিত অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগও উঠেছে। মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতির পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে নির্বাচন আটকে দেওয়ার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা চলছে। আদালতে একের পর এক রিট দাখিল করে নির্বাচন স্থগিত বা বিলম্বিত করার পথ সুগম করার চেষ্টা করছে একটি সুসংগঠিত পক্ষ।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি ও অন্যান্য প্রধান দল এই কৌশল সম্পর্কে অবগত। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাত বা অস্থিরতা তৈরি হোক—এমন অবস্থানে তারা নেই। বরং এই অবস্থার মধ্যেই বিএনপিকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো গণভোট ইস্যু। প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে মাঠে নির্বাচনী আমেজ গড়ে উঠেনি। বরং গণভোটকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে নির্দিষ্ট অবস্থানে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি যদি গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেয়, তাহলে তথাকথিত ‘জুলাই চেতনা’কে সামনে এনে জামায়াত, এনসিপিসহ ১০ দলীয় জোট বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচন বানচালের পথ তৈরি করবে।
এই বাস্তবতায় বিএনপি নির্বাচন বানচাল ঠেকানোর স্বার্থে কৌশলগত সমঝোতার পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। দলটির ভেতরে ভিন্ন মত থাকলেও নেতৃত্ব নির্বাচনকে যে কোনো মূল্যে ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। কারণ নির্বাচন পিছিয়ে গেলে বা ভণ্ডুল হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে সেই গোষ্ঠী, যারা ক্ষমতার আড়ালে থেকে সেফ এক্সিট এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস নিশ্চিত করতে চায়।
সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে এখন দৃশ্যমান দ্বন্দ্বের বাইরে আরেকটি অদৃশ্য সংঘাত চলছে। একদিকে নির্বাচন প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে সেই নির্বাচনকে ব্যবহার করে বা ধ্বংস করে নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা। এই সংঘাতের ফলই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের ক্ষমতার বিন্যাস এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির পরিধি।
