টাইম ম্যাগাজিনের চোখে তারেক: অন্ধকার জগতের রাজপুত্র থেকে ‘নিগৃহীত ত্রাণকর্তা’ হবেন?

টাইম ম্যাগাজিনের চোখে তারেক: অন্ধকার জগতের রাজপুত্র থেকে ‘নিগৃহীত ত্রাণকর্তা’ হবেন?
শেয়ার করুন

বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসনের পর দেশে ফিরে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান।

তিনি জানিয়েছেন, পারিবারিক উত্তরাধিকারের কারণে নয়, বরং দলের নেতা-কর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থনের জন্যই তিনি আজ বাংলাদেশে।

গত ১৮ মাস আগে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। টাইম ম্যাগাজিনের মতে, এই নির্বাচনে তারেক রহমানই বর্তমানে এগিয়ে।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি আমার বাবার বা মায়ের ছেলে বলে এখানে আসিনি। আমার দলের সমর্থকরাই আজ আমার এখানে থাকার মূল কারণ। ঢাকায় ফেরার পর শত শত মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন দূর করার জন্য তিনিই যথার্থ ব্যক্তি।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় আদালতের নির্দেশনা অনুসারে এক দশকেরও বেশি সময় স্থানীয় গণমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। বর্তমানে তিনি নিজেকে দেশের রাজনৈতিক অভিজাত এবং তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে তুলে ধরছেন।

টাইম ম্যাগাজিন তাকে সমর্থকদের কাছে ‘নিগৃহীত ত্রাণকর্তা’ এবং সমালোচকদের কাছে ‘ডার্ক প্রিন্স’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অতীতে তিনি ‘খাম্বা তারেক’ নামেও পরিচিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অতীতের দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেছেন, তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যেই তার আগের সাজাগুলো বাতিল করেছে। আন্দোলনে প্রাণ হারানোদের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান নিজের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন। তার পরিকল্পনায় রয়েছে ১২ হাজার মাইল খাল খনন, প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন বৃক্ষরোপণ, ঢাকায় সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, কারিগরি কলেজ ও স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন।

তিনি বলেন, আমি যা পরিকল্পনা করেছি তার ৩০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।

বিএনপির আগের শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। পর পর ৫ বার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ সেসময়।

একটি ফাঁস হওয়া মার্কিন বার্তায় তাকে ‘ক্লেপটোক্র্যাটিক সরকার ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব বিতর্কের প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, তার প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা ২০ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের রফতানি-নির্ভর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন, আমি দেখব আমার দেশের স্বার্থ। তবে আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি।

তিনি বোয়িং ক্রয় এবং জ্বালানি প্রকল্পসহ বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

দীর্ঘদিন লন্ডনে থাকার পর তিনি সংক্ষেপে বলেছেন, আমার স্বাধীনতা।

নিজের মিশন সম্পর্কে স্পাইডার-ম্যানের বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরাট ক্ষমতার সঙ্গে বিরাট দায়িত্বও আসে। আমি এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।

টাইম ম্যাগাজিন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি শাসনামলে দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ টানা ৫ বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।

সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে হয়তো শেষ পর্যন্ত আরেকজন স্বার্থপর অভিজাত ব্যক্তির উত্থান ঘটতে পারে।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ এবং দণ্ড হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার সব দণ্ড বাতিল হয়েছে।

টাইম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি অভিযোগে তিনি ১৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা তৈরি হয়, যা এখনও তাকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসার কারণে তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেছেন, খুব বেশি শীত পড়লে আমার পিঠে ব্যথা বেড়ে যায়। তবে আমি একে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার স্মারক হিসেবে দেখি। আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।

Visited 14 times, 1 visit(s) today