নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি লাগামছাড়া: আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও দেশের বাজারে নেই প্রভাব

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি লাগামছাড়া: আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও দেশের বাজারে নেই প্রভাব
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্ববাজারে কয়েকটি খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও রমজানকে সামনে রেখে দেশের বাজারে বেশিরভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে ছোলা ও খেজুরের মতো কিছু পণ্যে সামান্য স্বস্তি মিলেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে চাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা ও খেজুরের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এক মাস ও এক বছরের দামের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রমজান মাসে এসব পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি থাকে।

চালের বাজারে বিপরীত চিত্র

গত এক মাসে দেশে স্বর্ণা ও চায়নাসহ মোটা চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ৮.৫৭ শতাংশ। বর্তমানে এসব চাল প্রতি কেজি ৫৪ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে একই সময়ে এ ধরনের চালের দাম ১৮.৬৫ শতাংশ কমে টনপ্রতি ৪২৩ ডলারে নেমেছে। তবে এক মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে দাম ৪.১৯ শতাংশ বেড়েছে।

ভোজ্যতেলে বাড়তি চাপ

দেশের বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে ১.৫৭ শতাংশ এবং এক বছরে ১২.৮৩ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ৩.০৩ শতাংশ কমেছে, যদিও বছরে বেড়েছে ৯.২৭ শতাংশ। একইভাবে পাম অয়েলের দাম দেশীয় বাজারে বাড়লেও বিশ্ববাজারে এক বছরে ১১.৮২ শতাংশ কমেছে।

ডাল ও চিনিতে ভিন্ন প্রবণতা

মাঝারি ও ছোট দানার মসুর ডালের দাম দেশে বছরে বেড়েছে, তবে মোটা দানার ডালের দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ট্রেলিয়ায় মসুর ডালের দাম ৩০.৯২ শতাংশ এবং ভারতে ৯.০৯ শতাংশ কমেছে। এই দুই দেশ থেকেই বাংলাদেশে ডাল আমদানি হয়।

চিনির ক্ষেত্রে গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত চিনির দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের হিসাবে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজার—দুই জায়গাতেই চিনির দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।

 

পেঁয়াজে স্বস্তি, রমজানপণ্যে মিশ্র চিত্র

দেশে নতুন পেঁয়াজ ওঠা শুরু হওয়ায় গত এক মাসে পেঁয়াজের দাম ১৮.১৮ শতাংশ কমেছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে তা ২৪.১৪ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদা, রসুন ও ছোলার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে বেশি হারে কমেছে—যদিও রমজানে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে।

খেজুরের ক্ষেত্রেও কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। আমদানিনির্ভর এ পণ্যের দাম গত এক মাসে ২.৬৭ শতাংশ কমে বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খেজুরের দামের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

ভোক্তারা সুফল পাচ্ছেন না

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায়ীদের কারসাজি এবং টাকার দরপতনের প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল দেশের ভোক্তারা পাচ্ছেন না।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ব্যবসায়ীদের অসাধু চর্চা ও দুর্বল মনিটরিংয়ের কারণে দাম কমলেও তা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না। তার মতে, ডলারের দামের অজুহাত দেখানো হলেও বাস্তবে এর প্রভাব এখন সীমিত।

সরকারের আশাবাদ

টাস্কফোর্স বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আসন্ন রমজানে কিছু পণ্যের দাম কমবে। গত বছরের তুলনায় এ বছর নিত্যপণ্যের আমদানি ৪০ শতাংশ বেশি হওয়ায় বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ীরাও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

ভোজ্যতেল নিয়ে শঙ্কা

তবে একই বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। রমজানে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন। গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে মোট ৩.৬৬ লাখ টন ভোজ্যতেল আমদানি হলেও আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৩.৭২ লাখ টন।

চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির জন্য ৩.৯২ লাখ টনের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম (৪.৫১ লাখ টন)। ফলে রমজানকালে সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে।

আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি রোজা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে খোলা এলসির বিপরীতে আমদানিকৃত তেল তখন বাজারে আসবে। তবে এলসি খোলার পরিমাণ কম হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

Visited 16 times, 1 visit(s) today