নিজস্ব সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জের বিতর্কিত পরিবারের সন্তান ও ছাত্রলীগের কমিটিতে গুপ্ত সংগঠন শিবির কর্মীদের কাছে সর্বোচ্চ সংখ্যক পদ বিক্রি করার অভিযোগে অভিযুক্ত নেতা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফজলে রাব্বী স্মরণ এবার নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। লন্ডনে অবস্থানরত তার নিকটাত্মীয় জামায়াত মনোনীত সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাইছেন।
সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও নির্বাচনীয় এলাকায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ নিজ দলের নেতাকর্মীদেরকে শিশির মনিরকে ভোট দিতে ফোন করে আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি; ফোন পেয়েছেন এমন কয়েকজন নেতা এমন অভিযোগ করেন।
উল্লেখ্য, শিশির মনিরের সহযোগিতায় স্মরণ ও তার খালু সাবেক এমপি ড. মোহাম্মদ সাদিক দেশ ছেড়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
শিশির মনিরের বাবা হাওরাঞ্চলের কুখ্যাত রাজাকার মুকিত মনিরের বাড়িতেই বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ১৯৭১ সনে নিহত হন স্মরণের নানা মনোয়ার আলী। অথচ সেই শিশিরের জন্য ভোট চাওয়া স্মরণ সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের দায়িত্ব পেয়েছেন মর্মে গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন।
আওয়ামী লীগকে ডুবিয়ে জামায়াত-শিবিরকে গত ১৭ বছর ধরে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বিতর্কিত পরিবারের সন্তান স্মরণ যুবলীগের দায়িত্ব পাওয়ায় এবং নির্বাচনে শিশিরের পক্ষে কাজ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা। কিন্তু রাজাকারপুত্র শিশির মনিরের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না।
হাওরের ফসলরক্ষা প্রকল্পের কাজ বন্ধ: দলীয় লোকদের কাজ দিচ্ছেন জামায়াত প্রার্থী শিশির মনির
দিরাই-শাল্লার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী খালেক, মুকিত মনির, এলিম উদ্দিন, সোবহান ডাক্তারের বাড়িতে আশ্রয় নেন স্মরণের নানা মনোয়ার আলী। শিশির হলেন রাজাকার মুকিত মনিরের পুত্র এবং রাজাকার খালেক-সোবহান ডাক্তারের ভাতিজা। সেসময় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে খালেক ও মুকিত রাজাকার অবস্থান নেন। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অভিযান চালান মুকিত মনিরের বাড়িতে। তখন স্মরণের নানা মনোয়ার আলী বেরিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের থামান।
এসময় রাজাকাররা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা করতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাজাকারের বাড়িতে নিহত হন স্মরণের নানা মনোয়ার আলী। এসব ঘটনা অ্যাডভোকেট আলী ইউনুসের ‘মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ’, অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর ‘রক্তাক্ত একাত্তর’, আবু সুফিয়ানের ‘মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ: গণহত্যা ও অন্যান্য’ বইয়ে উল্লেখ আছে।
শিশির মনির কুখ্যাত রাজাকারের ছেলে, তার পুরো পরিবার গণহত্যায় জড়িত
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে সরকার গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। মুকিত মনিরসহ রাজাকারদের বিরুদ্ধে মামলা হলে স্মরণের মা মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভানেত্রী ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার নানাভাবে বাধা প্রদান করেন। বাধা প্রদানের বিষয়টি যুদ্ধাপরাধ মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি আব্দুল হান্নান চৌধুরী লিখিতভাবে আওয়ামী লীগকে জানান এবং যুদ্ধাপরাধের মামলার সিডিতে বিস্তারিত উল্লেখ করে গেছেন।
তবুও আওয়ামী লীগের আদর্শহীন বলয়কে ম্যানেজ করে স্মরণ, তার মা ও পরিবার আওয়ামী লীগের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পরিবারকে সুরক্ষা দিয়েছে। ৫ই আগস্টের পর এর প্রতিদান পাচ্ছেন এখন স্মরণ ও তার পরিবার।
আজ পেরুয়া গণহত্যা দিবস: শিশির মনিরের বাবা-চাচার নেতৃত্বে ধর্মান্তরিত করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় ২৬ জনকে
জানা গেছে, শিশির মনিরের বাড়িতে আশ্রয় নেন স্মরণ, তার খালু ড. মোহাম্মদ সাদিক, খালা জেসমিন সাদিকসহ পরিবারের অনেকেই। শিশির পরে স্মরণ ও সাদিককে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরলে যেন আবার সুবিধা নিতে পারেন এজন্য শিশির মনিরকে দিয়ে গণমামলায় স্মরণকে লোকদেখানো আসামি করানো হয় বলে কর্মীরা জানান।
স্থানীয় কর্মীরা জানান, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত স্মরণ প্রকাশ্যে প্রতিদান দিচ্ছেন। তিনি শিশির মনিরের পক্ষে কাজ করছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের আদর্শিক ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের বাদ দিয়ে জামায়াত ঘরানার কর্মীদের দিয়ে যুবলীগকে লোকদেখানো পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু করেছেন। বিশেষ করে শিশিরের পক্ষে কাজ করতেই তিনি যুবলীগের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
দিরাই-শাল্লার আওয়ামী পরিবারের একাধিক ব্যক্তি জানান, স্মরণ জামায়াত নেতা শিশির মনিরকে ভোট দিতে অনেককেই ফোন করছেন। যাদের ফোন দিতে পারেননি তাদেরকে ফোনদাতাদের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার খবর পাঠাচ্ছেন।
শিশির মনিরের প্রস্তাব: বিএনপিকে হটিয়ে জাময়াত-শিবিরকে নিয়ে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কমিটি গঠন
দিরাই উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সুমন বলেন, রাজাকারের বংশধর এখন আওয়ামী লীগের ওপর ভর করেছে। আর আওয়ামী লীগের রাজাকারের পক্ষের লোকজন জামায়াতের জন্য ভোট চাচ্ছেন। অথচ নির্বাচনী মাঠে বিএনপির এক বীর মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন। এর প্রতিদান ভোটের মাধ্যমে দিবে দিরাই শাল্লাবাসী। তারা রাজাকারের বংশধরকে প্রত্যাখান করবে।
সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, শিশির মনিরকে সহযোগিতা করতেই লন্ডনে বসে যুবলীগের দায়িত্ব নিয়েছেন স্মরণ। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করলে পদ মিলবে- এমন লোভ দেখিয়ে অনেককে ফোন করে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলেছেন।
তিনি আরও বলেন, এই পরিবারটি গত ১৭ বছর দলের সব সুবিধা নিয়েছে আর রাজাকার ও তাদের বংশধরদের সুরক্ষা দিয়েছেন। এখন আবার প্রকাশ্যে রাজাকারের ছেলের পক্ষে ভোট চাইছেন।

