ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আওয়ামীপন্থি ট্যাগ দিয়ে এক শিক্ষককে টেনেহিঁচড়ে পেটাতে পেটাতে প্রক্টর অফিসে সোপর্দ করেছেন যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীর গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির প্যানেল থেকে চাকসু বিজয়ী সন্ত্রাসী নেতারা।
আজ ১০ই জানুয়ারি, শনিবার বেলা ১২টায় আইন অনুষদে স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে।
এদিন আইন অনুষদের গ্যালারিতে পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান। এ খবর পেয়ে গুপ্ত সংগঠন শিবিরের সন্ত্রাসীরা আইন অনুষদের ডিন কার্যালয়ে অবস্থান নেন। হামলার আঁচ করতে পেরে শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান ঘটনাস্থল ত্যাগের চেষ্টা করলে শিবিরের সন্ত্রাসীরা তাকে ধাওয়া দিয়ে ধরে উপুর্যপরি পেটাতে থাকে। এভাবে পেটাতে পেটাতেই এই শিক্ষককে তারা প্রক্টর অফিসে নিয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, ওই শিক্ষককে জাপটে ধরে টেনেহিঁচড়ে রিকশায় তোলা হচ্ছে। তারপর রিকশাটি প্রক্টর অফিসের দিকে নিয়ে যায় শিবিরের সন্ত্রাসীরা।
এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন শিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান। চাকসুর দপ্তর সম্পাদক এই শিবির নেতা তার ফেসবুক পোস্ট থেকে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে যাচ্ছেন। একজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, মারধর করার পরেও তার বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনা। একজন শিক্ষককে পিটিয়ে, হেনস্তা করে, তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার আইনগত অধিকার তাকে কে দিয়েছে, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব মেলেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
শিক্ষক পেটানোর বিষয়টি অস্বীকার করে উগ্রপন্থি ও জঙ্গি মনোভাব পোষণকারী শিবির নেতা নোমান বলেন, আমরা আইন অনুষদে পরিদর্শনের সময় খবর পাই। খবর পেয়ে সেখানে যাই। আমাদের উপস্থিতির খবর পেয়ে তিনি আইন অনুষদের গ্যালারির পেছন দিয়ে দৌড়ানোর সময় ব্যাথা পান। কেউ আঘাত করেনি।
শিক্ষক হেনস্থার ঘটনাকে বৈধতা দিয়ে চাকসুর “আইন ও মানবাধিকার” বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি বলেন, এখানে বেশ কিছু শিক্ষক জুলাই চেতনার বিপক্ষে ছিলেন, যার মধ্যে সহকারী অধ্যাপক রোমান অন্যতম। আওয়ামী লীগ আমলে সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থেকে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। শাহ আমানত হলে গৃহশিক্ষক থাকাকালে হলকে আওয়ামী লীগের আস্তানায় পরিণত করেন তিনি।
শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান প্রক্টর অফিসে থাকা অবস্থায় জানান, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মব তৈরির মাধ্যমে তার ওপর হামলা করা হয়।
তিনি বলেন, পরীক্ষার হলে থাকা অবস্থায় মবের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেরে এক্সাম হল থেকে বেরিয়ে পড়ি। তখন চাকসু নেতারা চিৎকার-চেঁচামেচি করলে আমি সরে পড়তে যাই। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। জুলাই-আগস্টে আমি একদিনের জন্যও বেরোইনি, কোনো দায়িত্বেও ছিলাম না। মৌন মিছিলও করিনি। এমনকি শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের বোর্ডের সদস্যও ছিলাম না। সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে কারো বিরুদ্ধে মামলাও দিইনি।
ঘোষণা দিয়ে মব সন্ত্রাস চালালেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছিল নির্বিকার
শিবিরের সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত মব সন্ত্রাসের বৈধতা দিয়ে প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মব হয়নি। তিনি ‘হাসিনা সরকারের সৈনিক’, তাই তার মনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল যে তাকে মব করা হতে পারে। তাই তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়টি জানালে আমরা প্রস্তুতি নতে পারতাম, যেন শিক্ষকের মানহানি না হয়।
এখন যখন তাকে মারধর করা হয়েছে, মানহানি করা হয়েছে, এখন তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন- এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান। ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের পরিচয়ে তিনি নিয়োগ পাননি, দলীয় সুযোগ-সুবিধাও নেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনে স্বর্ণপদক বিজয়ী মেধাবী এই শিক্ষক বিসিএস (খাদ্য) উত্তীর্ণ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে।
মূলত তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপসারণের উদ্দেশ্যেই গুপ্ত সংগঠন শিবিরের এই পরিকল্পিত হামলা বলে জানান তার সহকর্মীরা।

