নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। এই সংকট দেখিয়ে বিক্রেতারা আদায় করছে ইচ্ছেমতো দাম। প্রায় তিনদিন ধরে এই অবস্থা চললেও ইউনূস সরকারের কর্ণপাত নেই।
অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি। অথচ ভোক্তাদের দুর্ভোগ নিয়ে নীরব ইউনূস সরকার ও প্রশাসন। দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট দমনের কোনও উদ্যোগই লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। এমন নজিরবিহীন ব্যর্থতায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভোক্তারা।
জানা গেছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বাজারে সেই দামের কোনো প্রতিফলন নেই। অধিকাংশ এলাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়, কোথাও কোথাও আরও বেশি দামে।
ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় সংকটের অজুহাত দেখিয়ে সিলিন্ডারপ্রতি ২ হাজার টাকা নেওয়ার তথ্য মিলেছে।
ঢাকার মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, মিরপুর, কল্যাণপুর, কাজীপাড়া ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। অনেক দোকানে আবার সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ভোক্তাদের এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফজল হোসেন বলেন, সবসময় সাধারণত সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০-৩০০ টাকা বেশি দিয়েই এলপিজি নিতে হয়। বৃহস্পতিবার পুরো এলাকা ঘুরে মাত্র এক দোকানে সিলিন্ডার পেয়েছি, যেখানে দাম চাওয়া হয় ১ হাজার ৯০০ টাকা।
তার প্রশ্ন, বাজারে এমন অরাজকতার দায়ভার কে নেবে?
একই এলাকার গৃহিনী শামসুন্নাহার বলেন, একে তো অতিরিক্ত দাম, তারওপর মরচে ধরা সিলিন্ডার দেখে ভয়ও হয়, কখন বিস্ফোরিত হয়ে মরি! সংকটের মাঝে বাছবিচার করতে গেলে রান্না বন্ধ হয়ে যাবে।
রামপুরার বাসিন্দা মো. আরিফ বলেন, আগে দু-একশ টাকা বেশি খরচ করলেও সিলিন্ডার পাওয়া যেত। কিন্তু গত দুদিনে ১ হাজার ৮০০ টাকার কমে কোথাও পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত মালিবাগ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় একটি সিলিন্ডার নিতে হয়েছে।
বাড্ডার আসমা খাতুন বলেন, আগামী মাস পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখব। যদি অবস্থার পরিবর্তন না ঘটে, তবে পুরোদমে ইলেক্ট্রিক কুকারে চলে যাবো। সরকারের দায়িত্বহীনতায় জনগণের এই ভোগান্তি। দেশে আদৌ সরকার আছে কিনা, বোঝার উপায় নেই।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সমস্যার মূল শুরু ডিস্ট্রিবিউশন বা পরিবেশক পর্যায় থেকে। পাইকারি সরবরাহ কম, তার ওপর বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বাড়ছে।
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা
এমনিতে পূর্ব নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি, এরইমধ্যে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম জানুয়ারি মাসে এক ধাক্কায় ৫৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, যা গেল ডিসেম্বর মাসে ১ হাজার ২৫৩ টাকা ছিল। ডিসেম্বর মাসে দাম বেড়েছিল ৩৮ টাকা। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন রোববার এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছে, সন্ধ্যা ৬টা থেকেই এলপিজির নতুন দর কার্যকর হবে।
রামপুরার মল্লিক ব্রাদার্সের প্রধান রণজিত মল্লিক বলেন, কোম্পানিগুলো নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। চাহিদা জানালে কয়েকদিন পর সিলিন্ডার আসে।
তিনি জানালেন, ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে তাদেরই ১ হাজার ৫২০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে এখন। পরিবহন খরচ যোগ করলে ১ হাজার ৭০০ টাকার কমে বিক্রি করা সম্ভব নয়।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু জাহাজ সংকটে পড়েছে। এর ফলে ডিসেম্বর মাসে দেশে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
এলপিজি ব্যবসায়ী ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ জানান, সাধারণ সময়ে মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হলেও ডিসেম্বরে তা নেমে এসেছে প্রায় ৯০ হাজার টনে। এতে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে তার দাবি, তারা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই এলপিজি সরবরাহ করছেন। খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির দায় তাদের নয়।
তার কথাতেই সিন্ডিকেটের কারসাজির ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও কোনো ব্যবসায়ী এ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খুচরা ব্যবসায়ী জানালেন, সিন্ডিকেটের কারণেই খুচরা পর্যায়ে এই দাম বৃদ্ধি। নইলে অতীতে সিলিন্ডার সংকট ছিল না কখনই।
এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, সরবরাহ কম থাকলেও ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি নেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা আইনত দ-নীয় অপরাধ। তবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ক্ষমতার ঘাটতির কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিইআরসি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারায় ভোক্তাদের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি বিইআরসির নজরে আসার পর সংস্থাটি লোয়াবকে চিঠি দিয়ে নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, আমদানি খরচ বেড়ে গেলে কোম্পানিগুলো প্রমাণসহ কমিশনে তথ্য জমা দিতে পারবে। তখন মূল্য সমন্বয় বিবেচনা করা হবে। এর আগে বাড়তি দামে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।
এলপিজির পাশাপাশি রাজধানীর অনেক আবাসিক এলাকায় পাইপলাইনেও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
নাখালপাড়ার বাসিন্দা মিনা সরকার জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই তার বাসায় গ্যাস নেই।
শ্যাওড়াপাড়ার গৃহিনী মুনিরা ফেরদৌস বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ। কয়েকদিন ধরেই লাইনে চাপ কম ছিল।
গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এ সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্প খাতে সরবরাহ অগ্রাধিকার দেওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত।
