নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাইয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় পার্টি (একাংশ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একাধিক মনোনয়ন বাতিলের পেছনে যেসব কারণ দেখানো হচ্ছে—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন নিজেই প্রয়োজনীয় ভোটার তথ্য সরবরাহ না করায় তারা কার্যত প্রতিকূল অবস্থার শিকার হচ্ছেন।
চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ বিভিন্ন আসনে শনিবার মনোনয়ন যাচাই–বাছাই শেষে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ও আলোচিত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
জাপার আনিসুলের মনোনয়ন বাতিল
চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসনে জাতীয় পার্টির (একাংশ) চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন। রিটার্নিং কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া দলীয় মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন থেকে পাঠানো মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের মিল না থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় আনিসুল ইসলামের পক্ষে থাকা এক আইনজীবী অভিযোগ করেন, প্রার্থী পক্ষের প্রস্তাবক ও সমর্থনকারীকে সম্মেলনকক্ষে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, যা যাচাই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একই আসনে তিন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল করা হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, এক শতাংশ ভোটারের তালিকা থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে যাচাই করা ১০ জনের মধ্যে কয়েকজনের স্বাক্ষরের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ঢাকায় পাঁচ আসনে ১২ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল
ঢাকা জেলার পাঁচটি আসনে মনোনয়ন যাচাই শেষে জেলা প্রশাসন ১২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছে। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, যাচাই হওয়া ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩০ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ঢাকা–১, ঢাকা–২, ঢাকা–৩ ও ঢাকা–১৯ আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে এসব মনোনয়ন বাতিল হয়। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা–২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হক এবং ঢাকা–১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী নূরুল ইসলাম। মোট ১২ জনের মধ্যে ৯ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী।
ঢাকা–৩ আসনে ঋণখেলাপি ও এক শতাংশ ভোটারের তথ্যের গরমিল দেখিয়ে আটজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। তাদের মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
তাসনিম জারার মনোনয়ন বাতিল ও অভিযোগ
ঢাকা–৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়। ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন জানান, যাচাইয়ের সময় প্রস্তাবক ও সমর্থনকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত ১০ জনের মধ্যে দুজন ঢাকা–৯ আসনের ভোটার নন—এ কারণে নির্বাচনবিধি অনুযায়ী মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
তবে তাসনিম জারা অভিযোগ করে বলেন, স্বাক্ষরকারী ওই দুজন নিজেরাও জানতেন না যে তারা সংশ্লিষ্ট আসনের ভোটার নন। একজন খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা, যেখানে একাধিক সংসদীয় আসন রয়েছে। আরেকজন জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ঢাকা–৯-এর ভোটার হলেও নির্বাচন কমিশনের অনলাইন ডেটাবেজে তাকে শরীয়তপুরের ভোটার দেখানো হয়েছে।
তাসনিম জারার ভাষ্য, “ভোটার কোন আসনের—এই তথ্য জানার কোনো কার্যকর উপায় নির্বাচন কমিশন দেয় না। অথচ ভুল হলে শাস্তি পাচ্ছেন প্রার্থীরা।”
তিনি মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
ভোটার তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ
মনোনয়ন বাতিল হওয়া একাধিক প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর যাচাইয়ের নিয়ম থাকলেও নির্বাচন কমিশন ভোটারদের আসনভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য কোনো সহজ বা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা দেয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, নির্বাচন কমিশনের অনলাইন ডেটাবেজে ভোটার তথ্য হালনাগাদ না থাকায় ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দায় পুরোপুরি প্রার্থীর ওপর চাপানো হচ্ছে।
আপিলের সুযোগ, তবে আস্থা সংকট
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল করতে পারবেন। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। তবে প্রার্থীদের একটি অংশের দাবি, নির্বাচন কমিশনের তথ্যব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সহায়তা না থাকলে আপিলেও প্রকৃত সমাধান মিলবে না।
মনোনয়ন যাচাই–বাছাইয়ের এই ধাপে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রস্তুতি এবং ভোটার তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
