নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সচিবালয়ের বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত—এমন অভিযোগ এখন প্রশাসনের ভেতর থেকেই উঠছে। একাধিক মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি কার্যত সচিবালয়ে একটি ‘অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্র’ তৈরি করেছেন। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মন্ত্রণালয়ে হাজির হয়ে উপদেষ্টা ও সচিবদের কাছে তদবির তুলছেন তিনি—যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বর্তমানে কর্মরত অন্তত ছয়জন সচিব ও তিনজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, জুনায়েদ সাকির নিয়মিত উপস্থিতি এখন দপ্তরগুলোর জন্য রীতিমতো চাপের কারণ। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কথা সামনে রেখে ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানানো হচ্ছে। একজন সচিব বলেন, “প্রথমে সৌজন্য ভেবেছিলাম, এখন স্পষ্ট—এটা চাপ।”
তদবিরের পাশাপাশি দপ্তরের কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দপ্তরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা প্রশাসনের ভেতরে আলোড়ন তুলেছে। দপ্তর সূত্র জানায়, সচিবের কক্ষে অপেক্ষাকালে জুনায়েদ সাকি চা খেতে চান। চা আনতে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক অফিস সহায়ক সামান্য দেরি করায় তাকে প্রকাশ্যে বকাঝকা করা হয়। এক প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তা বলেন, “একজন রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে এমন আচরণ স্পষ্ট ক্ষমতার দম্ভ ছাড়া কিছু নয়।” ঘটনাটিকে অনেকেই কর্মচারীদের প্রতি অবমাননাকর আচরণ হিসেবে দেখছেন।
গতকাল সচিবালয়ের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনের দপ্তরের সামনে অন্তত আধা ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায় জুনায়েদ সাকিকে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে পণ্য আমদানির অনুমোদন নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তদবির করতেই তার এই উপস্থিতি। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেই নিয়মিত দেখা যাচ্ছে জুনায়েদ সাকিকে। গত বৃহস্পতিবার বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানার দপ্তরের সামনেও তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায়। প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে—অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একজন রাজনৈতিক নেতার এমন অবাধ সচিবালয় যাতায়াত আদৌ কার স্বার্থে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সচিব বলেন, “অনেক সময় বিব্রত এড়াতে সামনের দরজা দিয়ে বের হই না। এটা স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ নয়।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক অফিস সহকারী জানান, গত সপ্তাহে জুনায়েদ সাকি উপদেষ্টার নাম ব্যবহার করে একটি ফাইল পাস করানোর চেষ্টা করেন। সচিব লিখিত নির্দেশ ছাড়া কাজ করবেন না জানালে এরপর থেকেই তিনি উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনের দপ্তরে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগে প্রভাব বিস্তার ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে। প্রশাসনিক ও বেসরকারি একাধিক সূত্রের দাবি, মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপদেষ্টা থাকাকালীন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জুনায়েদ সাকির একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়। একটি বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, সচিবালয়ে পরিচয়ের পর জুনায়েদ সাকি তাকে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে একটি হোটেলে বৈঠকে বড় কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে জানান, উপদেষ্টা ও সচিবদের জন্য ‘মোটা অংকের’ টাকা দিতে হবে। ওই ঠিকাদারের দাবি অনুযায়ী, নগদ অর্থ দেওয়ার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এই সব অভিযোগ একত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পর্দার আড়াল থেকে কারা সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করছে? রাজনৈতিক তদবির, দপ্তরভিত্তিক চাপ ও সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ কি আদৌ তদন্তের মুখ দেখবে?
