নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ভেতরে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড, কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা ও ভারতীয় নাগরিক সন্দেহে সহিংসতার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে যখন বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়ছে, ঠিক সেই সময় ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্থাপনার বাইরে সহিংস ঘটনার জেরে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে আবারও তলব করেছে ঢাকা।
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশন ও হাই কমিশনারের বাসভবনের বাইরে দুঃখজনক ঘটনা এবং সোমবার (২২ ডিসেম্বর) শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগের কথা ভারত সরকারকে জানিয়েছে বাংলাদেশ। এসব ঘটনায় বিভিন্ন চরমপন্থি গোষ্ঠী জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন চত্বরের বাইরে সহিংস বিক্ষোভ ও ভাঙচুর কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তি ও সহনশীলতার পরিপন্থী।
বাংলাদেশ সরকার এসব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত, ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একাধিক ভারতবিরোধী ঘটনার কারণে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ভিসা প্রদান সীমিত বা স্থগিত করা এবং কূটনৈতিক কার্যক্রম শিথিল করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এর আগে চট্টগ্রামে ভারতের উপ-হাইকমিশনারের বাসভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর ভারতের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক স্থাপনা ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও ভারতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে হয়রানি বা সহিংসতার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক বার্তা দেয়।
এসব ঘটনার পর ভারত কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে তাদের উদ্বেগের কথা জানায়। ভিসা সেন্টার, কূটনৈতিক স্থাপনা ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক না হলে কূটনৈতিক কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে চট্টগ্রামসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভিসা সেবা সীমিত বা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হতে পারে। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক কিছু কূটনৈতিক কার্যক্রম শিথিল করার বিষয়েও অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলছে, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড বা কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক স্থাপনা ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
